যাদের কাঁধে পৌঁছে যায় আপনার পণ্য
গ্রাহকের ঠিকানায় পণ্য ডেলিভারি দিতে বাইসাইকেল চালিয়ে ছুটছিলেন গোলাম রব্বানি। মাথায় তখন তার একটাই ভাবনা: এই মহামারীর বিপদ কী তার পরিবার কাটিয়ে উঠতে পারবে?
রব্বানির প্রতিটা দিন আসে নতুন চ্যালেঞ্জ হাতে করে। মহামারীতে তা যেন হয়ে উঠেছে আরো অনিশ্চয়তায় পূর্ণ।
রব্বানি স্মৃতিচারণ করে বললেন, 'আমার আব্বা একটি অ্যাপারেল কারখানায় দারোয়ানের কাজ করতেন। এপ্রিলে শাটডাউনের মধ্যেই সেই চাকরি চলে যায়। তখন আমাদের সবার মনে হয়েছিল যেন পায়ের তলা ঠেকে মাটি সরে গেছে।'
'পাঁচ সদস্যের নিজ পরিবারের পথে নামা ঠেকাতেই তখন আমি এগিয়ে আসি।'
'দশম শ্রেণি পড়ুয়া কারো ভালো চাকরির কোনো সুযোগ না থাকায় আমি একটি হোম ডেলিভারি কোম্পানির পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চাকরি নেই। এই চাকরির সুবাদে আমার পরিবার কোনোমতে এযাত্রা বেঁচে গেছে।'
বর্তমান সম্পর্কে তিনি জানান, 'এখন সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ অনেক দ্রুত ছড়াচ্ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। এরমধ্যে আমার বাবা কোমরে তীব্র ব্যথা নিয়েই চাকরি হারান। তাই সবকিছু আরো বিপজ্জনক বলেই মনে হচ্ছে।'
মহামারীর সময় প্রকট আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে রব্বানির মতো হাজার হাজার তরুণ রাজধানী এবং শহরতলিতে বিভিন্ন হোম ডেলিভারি সার্ভিসে নিবন্ধন করেছেন।
এ জাতীয় ৩০টিরও বেশি কোম্পানি থাকলেও মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানেই কাজ করেন ৪৫ হাজার বেশি কর্মী। এসব কোম্পানির কোনো কোনোটির ঢাকার বাইরেও নেটওয়ার্ক রয়েছে।
অনলাইনে পণ্য অর্ডারের সাম্প্রতিক চাহিদায় ফুড পান্ডা, ইভ্যালি, দারাজ, সহজ এবং পাঠাও এর মতো কোম্পানি তাদের সেবার পরিধি বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। এজন্যেই কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যাদের সিংহভাগই হচ্ছে তরুণ। এই চাকরির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে; এটি শুরুর ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাঁধাধরা যোগ্যতার শর্ত নেই। আর মাসিক আয় হতে পারে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা।
নগরীর যানজট এড়িয়ে দক্ষ হাতে সাইকেল চালাতে চালাতে রব্বানিও চাকরির অনেক সমীকরণ করে মনে মনে।
প্রতিটি ডেলিভারির জন্য কোম্পানি তাকে দেয় ২৫ টাকা। কিলোমিটার প্রতি দুই টাকা আর শিফটের উপর ভিত্তি করে দেওয়া কিছু বোনাসও পাওয়া যায়।
এই কাজে শিফটই হচ্ছে যোগ্যতার মাপকাঠি। এজন্যেই যেকোনো সময় তা পরিবর্তনশীল। পণ্য সরবরাহকারী বা রাইডার যদি পরপর দুটি ডেলিভারি পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন, তখন তাকে কম যোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
দেরিতে পৌঁছে দিলেও কম রেটিংস মেলে। ছয়টি শিফটে কাজ করা কোনো রাইডার যদি কখনো পণ্য পৌঁছে দিতে ব্যর্থ না হন এবং সময়মতো তা করতে পারেন- তাহলে তাকে প্রথম শিফটে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর প্রতি ডেলিভারিতে বোনাস হিসাবে দেওয়া হয় ৯ টাকা।
দ্বিতীয় শিফটে বোনাস ৬ টাকা এবং তৃতীয় শিফটে ৩ টাকা। অন্য শিফটে যারা কাজ করেন তাদের ভাগ্যে কোনো বোনাস নেই।
এই যোগতার মানদণ্ডে টিকতে হলে কোনো কর্মীকে অবশ্যই নিয়মিত এবং কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা কখনোই ক্লান্তি অনুভব করা যাবে না। ভালো শিফটে কাজ করার সুযোগ পেতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।
ম্লান মুখে রব্বানি জানান, 'সারাদিন সাইকেল চালিয়ে যখন বাড়ি ফিরি তখন আমার সারা শরীর ব্যথা করে।'
তবে যখন কোনো গ্রাহক ৫টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা পর্যন্ত বকশিস দেন, তখন সে খুবই খুশি হয়। সামান্য কটা টাকাই তাকে দেয় মুক্তির স্বাদ আর নতুন উদ্দীপনা। এসব অনুভূতি কাজের যন্ত্রণাও কিছুটা কমায়।
''এক জায়গা থেকে অন্য জায়গার ট্রিপের ধরন আলাদা। ধানমণ্ডি, গুলশান এবং বারিধারার মতো এলাকায় যারা কাজ করে তারা ভালো বকশিস পায়। অন্যদিকে, আমাদের মধ্যে যারা অন্যান্য এলাকায় যেমন মিরপুরে কাজ করে তাদের ভাগ্যে তেমন উপরি পাওনা জোটে না। প্রায়শ'ই তারা কোনো বাড়তি টাকাই পায় না,'' রব্বানি বলছিলেন।
এই সরল অথচ ভারি সমীকরণের চাপে পিষ্ট আমাদের নগরীর তরুন ডেলিভেরি ম্যান রব্বানি। কাজের তাড়ায় অনুভূতি শূন্য হয়ে উঠেছে তার জীবন। এতটাই নিঃস্পৃহ সে যে দ্রুত ধাবমান কার, বাস আর মিনিভ্যানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চললেও তাদের উপস্থিতি যেন সে ভুলেই যায়।
নিজ মনে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিতে দিতে ভারবাহী পশুর মতোই বয়ে নিয়ে যায়; কখনো বড়সড় খাবারের ব্যাগ কখনোবা অন্য কোনো সামগ্রী। পরবর্তী চালান সঠিক সময়ে পৌঁছে দেওয়াই তার একমাত্র লক্ষ্য।
কিন্তু, দিনে দিনে প্রসারিত মহানগরীর জালের মতো সড়কের শিরা-উপশিরা বেয়ে, অন্ধগলি পেরিয়ে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া কী এতটাই সহজ?
রাইডারকে এজন্য একটি সড়কের সবকটা বাঁক আর মোড় মুখস্থ রাখতে হয়। কারণ, প্রতি বাঁকের পরই আরও অসংখ্য দিকে যেন চলে গেছে সড়কের নদী।
তাই অনেক সময় ঠিকানা ভুল হয় রব্বানির। পৌঁছে যায় ভুল ঠিকানায়। তখন গ্রাহককে একাধিক বার ফোন দিয়ে তাকে নির্দিষ্ট ঠিকানা জেনে নিতে হয়।
চলার পথে দুর্ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়।
ক্ষত হওয়া হাতটি দেখিয়ে সে বলে, 'আমার সামনে থাকা রিক্সাটি হঠাৎ করেই জোরে ব্রেক কষে। আর সঙ্গেসঙ্গেই আমি তার পেছনে গিয়ে ধাক্কা খাই। হঠাৎ করে খুব ভয়ঙ্করভাবে মাটিতে উল্টে পড়েছিলাম।''
উদীয়মান চাকরির বাজার:
কঠিন সংগ্রামের পরও রব্বানি উপলদ্ধি করে, করোনার এই দুঃসহ সময়ে এই চাকরির কল্যাণেই তার পরিবার টিকে আছে।
বেসরকারি খাতের অন্যান্য ছোটবড় প্রতিষ্ঠান যখন কর্মী সংখ্যা কমিয়েছে, ঠিক তখনই হোম ডেলিভারির ব্যবসাগুলো প্রবৃদ্ধির মুখ দেখেছে, বাড়িয়েছে কর্মীর সংখ্যাও।
মহামারীর আগে থেকেই চালু হওয়া এ ব্যবসা এখন দুর্যোগের মুহূর্তেই সবচেয়ে বাড়-বাড়ন্ত। প্রধান কারণ, ঘরে থাকা মানুষের ক্রমবর্ধমান ডেলিভারি সেবার চাহিদা।
তৈরি পোশাক শিল্পের অনেকেই যারা শাটডাউনের কালে চাকরি হারিয়েছিলেন তাদের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে এই খাতে। ফলে বেকারত্ব কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে উদীয়মান খাতটি।
অন্যদের চেয়ে রাইডার সংখ্যা বেশি ফুডপান্ডা'র। গোলাপি ব্যাগ বহন করা কোম্পানিটির পোশাক পরিহিত রাইডারদের সচরাচর খুব সহজেই চলার পথে চোখে পরে।
ফুডপান্ডা বাংলাদেশ শাখার মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আম্বারিন রেজা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, 'ঢাকায় ফুডপান্ডার ১৫ হাজার সক্রিয় রাইডার আছে। ক্যান্টনমেন্ট ও অন্যান্য সংরক্ষিত এলাকা বাদে আমরা ঢাকা মহানগরীর সকল এলাকায় ডেলিভারি দেই। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের আশেপাশে ও তার বাসভবন সংলগ্ন এলাকাতেও ডেলিভারি যায়।'
অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে; ইভ্যালি, পাঠাও ফুড, ফুডপিওন, দারাজ, চালডাল, হাংরিনাকি, মিনাক্লিক এবং আরো বেশকিছু ছোটখাট কোম্পানিতেও কাজ করেন বড় সংখ্যক রাইডার।
ইভ্যালির নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা ১৬ হাজার। এরমধ্যে ফুলটাইমার ৩,৬৮১ জন বলে আনুষ্ঠানিক সূত্রে জানা গেছে।
সহজের রাইডার সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। অন্যদিকে মিনাক্লিকে আছেন ১৩৫ জন। চালডালে ৬৫০ জন সার্বক্ষণিক দায়িত্বে আছেন। কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুসারে দারাজে ৪,২০০ জন রাইডার অর্ডার পৌঁছে দিতে কাজ করেন।
তবে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও 'পাঠাও' তাদের ডেলিভারির কাজ নিয়োজিতদের সঠিক সংখ্যা বিষয়ক প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
এছাড়া, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিছু আন্তঃনগরী পণ্য সরবরাহ বা কুরিয়ার কোম্পানিতেও কাজ করেন শত শত রাইডার। মহামারীর সময়ে তাদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছিলেন।
নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের ছাত্র এই চাকরি নিতে এগিয়ে আসে। এই সময়ে সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাটাও তার বড় কারণ। তাই খরচের অংক মেলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবারকে সাহায্য করতে তারা চাকরিটা নিয়েছে।
এখনও পুরুষ-প্রধান চাকরির এ সুযোগটি:
হোম ডেলিভারির চাকরিতে নারী রাইডারদের অনুপস্থিতি পরিষ্কার দৃশ্যমান। তৈরি পোশাক খাতে নারীরাই প্রধান চালিকাশক্তি হলেও, হোম ডেলিভারি যেন নির্দিষ্টভাবে পুরুষ কর্মী চালিত।
কোম্পানিগুলোও তাদের চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শুধু পুরুষ কর্মীর চাহিদাই উল্লেখ করে। এজন্য তারা নিরাপত্তাকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তবে এই নীতির কারণে শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ যে কোনো প্রকার আয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন সেটাও কিন্তু কঠিন বাস্তবতা।
