ওজনেই তার দর: অনিশ্চিত সময়ে মানুষ কেন স্বর্ণে বিনিয়োগ করে
সুপ্রাচীনকাল থেকে প্রাচুর্য প্রদর্শন আর অর্থনৈতিক লেনদেনে গুরুত্ব আছে স্বর্ণের। কিন্তু, এর মূল্য সম্পর্কে সবচেয়ে যথার্থ মন্তব্য করেছিলেন সম্ভবত বিশ্বের নামজাদা বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট।
১৯৯৮ সালে তিনি বলেন, ''আফ্রিকা বা বিশ্বের অন্য কোনো স্থানের মাটির নিচ থেকে উত্তোলিত হয় স্বর্ণের আকরিক। তারপর আমরা একে গলিয়ে শুদ্ধ করি। তারপর আরেকটি গর্ত খুঁড়ি, আর সেখানে লুকিয়ে রাখি। আবার সেই সঞ্চয় পাহারা দিতে টাকা দিয়ে লোকও ভাড়া করি। সত্যি বলতে স্বর্ণের তেমন কোনো অর্থনৈতিক উপযোগিতা নেই। আমার বিশ্বাস, মঙ্গলবাসী (কাল্পনিক) আমাদের এসব কীর্তিকালাপ দেখে দারুণ বিভ্রান্ত হয়ে মাথা চুলকাচ্ছেন।''
দুনিয়ার সেরা বিনিয়োগকারীর একথার দুই যুগ পর আজো আমরা স্বর্ণ ভালোবাসি, তাতে আস্থা রাখি। বিশেষ করে, অর্থনৈতিক মন্দার আপৎকালীন সময়ে সেই প্রীতি যেন বানের জোয়ারের মতো বাড়ে। চাহিদার টানে আকাশ ফুঁড়ে মহাশূন্যে চরতে থাকে দূর্লভ খনিজটির দর।
কোভিড-১৯ মহামারিতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশ্বব্যাপী দেখা দেওয়া উৎপাদন ও সেবাখাতের স্থবিরতার মাঝে সামর্থ্যবান এবং বিত্তশালীদের 'সোনার হরিণ' নিজ খাঁচায় বন্দি রাখার আগ্রহ দেখা গেছে। ফলে গত আগস্ট নাগাদ অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছে যায় স্বর্ণের বিনিময় দর।
উপদেশ যিনি দিয়েছিলেন, দেখা যাচ্ছে সেই বাফেটও ধাতুটির ব্যাপারে তার মনোভাব কিছুটা নরম করেছেন। তার বিনিয়োগ সংস্থা- বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে কিনেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বর্ণ খনি পরিচালক কানাডার ব্যাররিক গোল্ড কর্পোরেশনের সাড়ে ৫৬ কোটি ডলারের শেয়ার। বাফেটের এ বিনিয়োগ অর্থবহ ইঙ্গিত দেয় বৈকি।
অবশ্য স্বর্ণখনি কোম্পানির আংশিক মালিকানা কেনা, আসলে হলদে রঙা নাজুক ধাতুটি কেনার সমতুল্য নয়। কারণ খনি কোম্পানির শেয়ারের দর নির্ধারিত হয়; বাজারে স্বর্ণের মূল্য এবং সার্বিকভাবে পুঁজিবাজারে সেই মাফিক কোম্পানির বাজারমূল্য নির্ণয়ের বিচারে।
পুঁজিবাজারে যখন অন্যান্য উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের কোম্পানির বড় দরপতন দেখা দেয়, তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ে স্বর্ণখনি কোম্পানির বাজারদর। যদিও, এর মাধ্যমে প্রকৃত স্বর্ণের মতো বিনিয়োগ স্বর্গের গ্যারান্টি দিতে পারে না কোম্পানি শেয়ার। কারণ বাজারে মূল্যস্ফীতির একটা সীমা থাকে, এরপর দরপতন হওয়াটাই স্বাভাবিক পরিণতি হয়ে ওঠে।
একারণেই অধিকাংশ পুঁজি ব্যবসায়ী শেয়ারের চেয়ে, স্বর্ণ কিনে রাখাতেই বিশ্বাসী।
তবে সরকারি বন্ড বা অন্যান্য নিরাপদ বিনিয়োগ উৎসের মতো নয় স্বর্ণ। প্রতিষ্ঠিত এবং শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে সরকারি বন্ড কেনা থাকলে সুদসহ বড় অর্থপ্রাপ্তির গ্যারান্টি থাকে। আদর্শ উদাহরণ মার্কিন সরকারের ট্রেজারি বন্ড। এধরনের বন্ডের মাধ্যমে সরকার নাগরিকদের কাছ থেকে ঋণ নেয়, এবং ভবিষ্যতে মুনাফাসহ সমুদয় দেনা পরিশোধের নিশ্চয়তা দেয়।
নিরাপদ সম্পদ বলতে বোঝায়, স্থায়ী আয় সৃষ্টিকারী সম্পদকে। যার দামও একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর ওঠানামা করে, তুলনামূলক স্থির থাকে। সঙ্কটকালীন মুহূর্তে যা কোনোভাবেই স্বর্ণের দরের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
কারণ স্বর্ণকে মন করা হয়, পূর্ব উল্লেখিত বিনিয়োগ স্বর্গ হিসেবে। এর দর উত্থান-পতনের ধারাতেই থাকে, বিশেষ করে অনিশ্চিত সময়ে তা আরও বহুগুণে ওঠানামা করতে দেখা যায়। অন্যান্য খাতের বিনিয়োগে যখন চরম লোকসান হয়, তখন আগে কিনে রাখা স্বর্ণ বিক্রি করে বিপুল মুনাফা লাভ করেন অনেকেই। সঙ্কটকালের মেয়াদ এবং পরিস্থিতি বুঝে দর আকাশ ছোঁয়ার আগেই কিনে রাখেন সাবধানী বিনিয়োগকারীরা।
তবে আপৎকালীন সময়ের পর বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক হওয়ার আভাস পাওয়া মাত্র- স্বর্ণের মূল্যপতন হয়। গত দুই দশকে বড় দুইটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আগে এবং পরও এ প্রবণতা দেখা গেছে। ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময়ের সেই স্বর্ণ জোয়ার আবার ফিরে এসেছে চলমান কোভিড-১৯ দুর্যোগের সময়ে, তবে আরও বড় পরিসরে।
- লেখক পরিচিতি: ডির্ক বাওয়ের এবং তার সহকর্মী অ্যালান ট্রেঞ্চ দুজনেই ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়ন বিভাগের অধ্যাপক
- সূত্র: ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট
- অনুবাদ: নূর মাজিদ
