বনায়নের শ্রেষ্ঠ উপায় গাছ লাগানো?
আজ থেকে সাত বছর আগে পরিবেশ বিজ্ঞানী সুসান কুক প্যাটন পুনঃ বনায়ন নিয়ে তার ডক্টরেট পরবর্তী গবেষণা করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত স্মিথসোনিয়ান ইনভায়রোমেন্টাল রিসার্চ সেন্টারে। ওই গবেষণা চলাকালে ২০ হাজার গাছ লাগাতে সাহায্য করেন তিনি চেসেপিক উপসাগর তীরবর্তী এলাকায়।
এই অভিজ্ঞতা তাকে এক নতুন আবিষ্কারের সন্ধান দেয়। সুসান অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন তারা যেসব চারাগাছ লাগিয়েছেন- তার চাইতেও দ্রুত বেড়ে উঠেছে বন্য উদ্ভিদের সেসব চারা- যা তারা রোপণ করেননি।
সুসান স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'চারা রোপণের জন্য আমরা যে ভূমি সংরক্ষিত রেখেছিলাম, সেখানেই প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে উঠছিল এসব গাছ। আসলে এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতির ক্ষমতার কথা। সে জানে আসলে কী করতে হবে।'
চেসেপিক উপসাগরের ওই এলাকা শুধু নয়, পৃথিবীর অন্যান্য স্থানের জন্য একথা সমান সত্য। নেচার কনসার্ভেন্সি নামক সংস্থায় কাজ করা এ বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কখনো কখনো প্রকৃতিকেও বনায়নের সুযোগ করে দেওয়া উচিৎ।
সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায় তিনি এটা প্রমাণও করেছেন। গবেষণাটি বলছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট অরণ্য কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় যে অবদান রাখে- তা আমরা এতকাল অনেক নগণ্য করে দেখেছি।
বৃক্ষ রোপণের বৈশ্বিক তোড়জোড়:
বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সংরক্ষণের মূল আলোচনায় স্থান পাচ্ছে বৃক্ষ রোপণ। এই কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে দেশে দেশে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর মূল প্রচেষ্টায়। চলতি বছর সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে পৃথিবীজুড়ে এক লাখ কোটি গাছ লাগানোর আহবান জানানো হয়।
ট্রাম্প আমলে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে মার্কিন প্রশাসন হাতেগোণা যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যেও একটি ছিল বৃক্ষ রোপণ। বাণিজ্যিক কিছু প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান ফরেস্ট নামক একটি অলাভজনক সংস্থার সহযোগীতায় সাড়ে ৮৫ কোটি গাছ লাগানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। এর মাধ্যমে পুনঃবনায়ন করা হছে ২৮ লাখ একর জমিতে।
পরিবেশবান্ধব চুক্তির আওতায় চলতি বছর তিনশ' কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
এর বাইরে বন (জার্মান শহর) চ্যালেঞ্জ ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় বিশ্বব্যাপী ৮৫ কোটি একর জমিতে পুনঃবনায়ন করা হবে, সিংহভাগ ক্ষেত্রে চারা রোপণই হবে এর প্রধান উৎস। ভারতের চাইতেও আকারে বড় এ পরিমাণ জমি।
ভুলটা কোথায় হচ্ছে?
আগামী তিন দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত করতে বৃক্ষ রোপণকে প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। কার্বন শূন্য অর্থনীতির পরিকল্পনাও করা হয়েছে এ কর্মসূচী ঘিরে। কিন্তু, তা যথার্থ সমাধান নয়।
প্রথমত,অনেক আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন কৃত্রিম বনায়নের আড়ালে আসলে ভূমি দখলের প্রবণতা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী। কারণ, এধরনের বনে নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির গাছ লাগানো হয়, যেগুলো বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক এবং দ্রুত বেড়ে ওঠে। মনোকালচার পদ্ধতির এ বনায়ন কখনোই প্রাকৃতিক বনের সম্পূরক হয়ে ওঠে না। আকাসিয়া, ইউক্যালিপটাস এবং পাইনের মতো প্রজাতির চারা লাগিয়ে আর্থিক লাভকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন বৃক্ষ রোপণের চাইতে ধ্বংস হওয়া বনের জমি সংরক্ষণ করে ফেলে রাখা উচিৎ। সেখানে প্রাকৃতিক চক্রেই আসবে বনজ নানা প্রজাতির বীজ। ধীরে ধীরে আবার হারানো ভূমিকে সবুজে সাজিয়ে তুলবে আদি অরণ্য। কারণ প্রকৃতিই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো শিক্ষক।
এসব প্রভাব আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে কুক-প্যাটন স্টাডি খ্যাত সাম্প্রতিক গবেষণায়। নেচার জার্নালে প্রকাশিত এ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে সহ-লেখক হিসেবে ছিলেন ১৭ জন বিখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং একাডেমিক।
তারা জানান, প্রাকৃতিক বন পুনঃজন্মের মাধ্যমে যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করতে পারে- তার চাইতে ৩২ শতাংশ কম অনুমান করেছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গঠিত জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)। ক্রান্তীয় বা চিরসবুজ বনের ক্ষেত্রে সংস্থাটির অনুমান ছিল ৫৩ শতাংশ কম।
'প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠছে এমন বনের কার্বন শোষণের ১১ হাজার নমুনা সংগ্রহ করেছি। আর বিশ্বব্যাপী করা আড়াইশ' পূর্ব গবেষণাও পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি,' ইয়েল ইনভায়রোমেন্ট ম্যাগাজিনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুক জানান।
তাছাড়া, বনের কার্বন শোষণ ক্ষমতা অন্তত একশ' ধরনের পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। জলবায়ু, মাটি, উচ্চতা এবং ভূ-প্রাকৃতিক গড়ন এর মধ্যে অন্যতম।
'অনুঘটকগুলোর প্রভাবে হওয়া পরিবর্তন আবার একই দেশের একই ধরনের বনভূমির ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। তবে বাস্তুসংস্থান বৈচিত্র্যের জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,' তিনি যোগ করেন।
প্রাকৃতিক বনায়নের সুফল:
সুসান জানান, আমাদের গবেষণা প্রমাণ করেছে যে প্রাকৃতিকভাবে যে বন পুনঃরায় গড়ে ওঠে, সেটি অনেক দ্রুত বাড়তে পারে এবং তার কার্বন শোষণ ক্ষমতাও হয় কৃত্রিম বনায়নের চাইতে অনেক বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামী কয়েক দশকে কিছু বনের প্রাকৃতিক বিস্তার ক্ষমতা হ্রাস পাবে, বলে স্বীকার করা হয়েছে কুক-প্যাটন স্টাডিতে। কিন্তু, জানা গেছে আরেকটি চমৎকার বিষয়।
বিরূপ জলবায়ুর মধ্যেও বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড বেশি থাকায়- তা গাছেদের জন্য উর্বরতার উৎস হবে। গ্লোবাল গ্রিনিং নামে পরিচিত এ প্রবণতার আওতায় বাড়বে বন্য প্রজাতির বংশ বিস্তারের গতি। ফলে বনের পাশের জমি সংরক্ষণ করা হলে, সেখানে নিজে থেকেই নতুন বনায়ন অনেক দ্রুত গতিতে করতে পারবে প্রকৃতি।
মানুষের গাছ লাগানোর চাইতে যা অনেক বেশি কার্যকর হবে।
বর্তমান সময় থেকে এভাবে গড়ে ওঠা বন ২০৫০ সাল নাগাদ ৭,৩০০ কোটি টন কার্বন শোষণ করবে বলে জানান বিজ্ঞানীরা। এটি পৃথিবীর সাত বছর শিল্পোৎপাদনের ফলে নির্গত নিঃসরণের সমান। অর্থাৎ, কৃত্রিম বনায়নের চাইতেও কার্যকর সমাধান দেখাচ্ছে প্রকৃতি। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যা মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।
- সূত্র: ওয়্যারড ডটকম
