বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির পরিকল্পনা ইনফান্তিনোর, ফুটবলে 'পারমাণবিক বোমা'র মতো প্রভাবের শঙ্কা
বিশ্বফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা উয়েফা ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানতে পেরেছে টেলিগ্রাফ স্পোর্টস। এর মাধ্যমে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি মুখোমুখি লড়াইয়ে নামতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি।
যদিও এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে এখনো কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি হয়নি, তবে এটি কার্যকর হলে বিশ্বকাপের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার বা চার বছরের নির্দিষ্ট বিরতির চেয়ে আরও ঘন ঘন বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে। ফুটবলের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা এই পরিকল্পনাকে ফুটবল বিশ্বের জন্য একটি 'পারমাণবিক বোমা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্য একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'তিনি নিশ্চিতভাবেই পাগল হয়ে গেছেন। আমরা এর বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করব।'
এই খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি ও লাইসেন্সিংসহ ফিফার সমস্ত বাণিজ্যিক অধিকার পুরোপুরি বেসরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় চলে যাবে।
'ফুটবল আমাদের কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় – এটা বিক্রি করার অধিকার ফিফার নেই'
এক বিবৃতিতে উয়েফা জানিয়েছে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর যে সীমা কখনোই অতিক্রম করা উচিত নয়, এই সিদ্ধান্ত সেই সীমানা লঙ্ঘন করেছে। উয়েফা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। ফুটবলের প্রতিটি জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনেরও এটিকে সেভাবে দেখা উচিত। একই সঙ্গে লিগ, ক্লাব, খেলোয়াড়, সমর্থক, সরকার এবং ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা চিন্তা করেন— প্রতিটি অংশীদারেরই এতে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ফুটবলের আত্মা এবং পরিচালনা ব্যবস্থা বেচাকেনার কোনো সম্পদ নয়— বিশেষ করে যখন কারা এর থেকে সামাজিকভাবে লাভবান হবে সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতাই নেই। আমাদের কেউ ফুটবলের মালিক নই। এটি বিক্রি করার কোনো অধিকার ফিফার নেই।'
অন্যদিকে, মঙ্গলবার বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফিফা জানিয়েছে, তারা ফুটবল উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা ফিফা সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।'
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, 'পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ফুটবল উন্নয়ন কার্যক্রম উপকৃত হবে এবং ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনই এই বাড়তি তহবিল ব্যবহারের সুবিধা পাবে।'
প্রস্তাবিত ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রকল্পের আওতায় ফিফার সব বাণিজ্যিক ও ইভেন্ট পরিচালনা কার্যক্রম একীভূত করা হবে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ প্রকল্পের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।
মূলত এফএফই-এর প্রারম্ভিক শেয়ার মূল্যমান ২০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে। আর তা করা হবে 'সতর্কতার সাথে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের বাছাই করার মাধ্যমে, যারা এফএফই-এর নিয়ন্ত্রণহীন সংখ্যালঘু শেয়ার বা মালিকানা কিনে নেবে'।
পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছে, 'এফএফই থেকে অর্জিত সমস্ত নিট মুনাফা বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নে পুনরায় বিনিয়োগ করা হবে।'
তবে পরিকল্পনার সাথে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যালয় হোয়াইট হাউসের কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
মালিকানা বিক্রির এই প্রক্রিয়া কারা পরিচালনা করবে?
বিলিয়নিয়ার বিনিয়োগকারী জোশুয়া কুশনারের মালিকানাধীন ও পরিচালিত প্রতিষ্ঠান 'থ্রাইভ ইটারনাল' এফএফই-এর জন্য 'প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী দলের' নেতৃত্ব দেবে।
টেলিগ্রাফ স্পোর্টস জানতে পেরেছে যে, ব্যান ভেঞ্চারসের প্রধান নির্বাহী এবং ফর্মুলা ওয়ান কেনাবেচার সময় 'লিবার্টি মিডিয়া'র সাবেক সভাপতি ও সিইও গ্রেগ মাফেই এই প্রকল্পের মূল বাণিজ্যিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন এবং তিনি এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকবেন।
ফিফার পক্ষে পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি করবে আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান 'জেপি মরগ্যান'। পাশাপাশি 'ওপেনইকোনমিক্স'-এর মতো অন্যান্য পরামর্শক সংস্থাগুলো সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ফিফার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, 'এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যময় এমন একটি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী গঠন করা, যা ফিফা ও ফুটবলের বৈশ্বিক চরিত্রকে প্রতিফলিত করবে। এখন পর্যন্ত ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া ও আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রতিটি প্রধান অঞ্চল থেকেই বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।'
ইনফান্তিনো বলেন, 'আমাদের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির জন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে ফুটবলের বাণিজ্যিক অংশ একটি নিবেদিত ও লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে পরিচালিত হবে এবং এর মূল্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও ভালোভাবে ভাগাভাগি হবে। ফিফার প্রতিটি সদস্য সংস্থার উচিত নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণের জন্য প্রাপ্য অর্থায়নের ন্যায্য অংশ পাওয়ার সুযোগ পাওয়া, অন্যের ওপর নির্ভর না করে। এটি বিশ্বব্যাপী ফুটবলের গণতান্ত্রিকীকরণের বিষয়।'
কে হবেন এর মূল সুবিধাভোগী?
পরিকল্পনাটি অনুমোদন পেলে ফিফা তার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেককে 'এককালীন মূলধন' হিসেবে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ দেবে।
শর্তাবলীতে উল্লেখ করা হয়েছে, 'এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক হবে এবং কোনো সদস্য অ্যাসোসিয়েশনকে এতে অংশ নিতে বাধ্য করা হবে না। এফএফই-এর প্রস্তাবিত প্রারম্ভিক মূলধন সংগ্রহের ৪.২ বিলিয়ন ডলার থেকেই এই অতিরিক্ত তহবিলের জোগান দেওয়া হবে।'
দ্য টাইমস এবং ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস প্রথম এই খসড়া পরিকল্পনার খবর প্রকাশ করেছিল। দ্য টাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এই পরিকল্পনার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে পরামর্শ করা হয়েছিল। তবে আলোচনার সাথে ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এতে হোয়াইট হাউসের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা উড়িয়ে দিয়েছে।
২০৩১ সালে ফিফায় সভাপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইনফান্তিনো এই নতুন গঠিত প্রতিষ্ঠানের 'কমিশনার' হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই ধরনের পদ থেকে তিনি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পকেটে পুরবেন বলেই আশা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রধান হিসেবে নিজের অবস্থান রক্ষায় দেওয়া এক বিতর্কিত বক্তব্যের পর থেকেই ইনফান্তিনোর ওপর চাপ বাড়ছিল। এ পদক্ষেপ সেই চাপের মধ্যেই এসেছে।
ফিফা অবশ্য ২০৩১ সালে ইনফান্তিনো নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হবেন—এমন দাবি অস্বীকার করেছে।
এক বিবৃতিতে ফিফা যোগ করেছে, 'তবে ফিফার অনুচ্ছেদ ও নিয়মকানুনের সাথে সংগতি রেখে ফিফার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর স্বার্থ রক্ষায়— পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে— ফিফা সভাপতি এবং ফিফা প্রশাসনকে অবশ্যই এই সংস্থায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করতে হবে।'
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, 'জ্যারেড কুশনার কোনো বিনিয়োগকারী নন'। একই সাথে এই গোপন পরিকল্পনা নিয়ে ফিফা কর্মীরা কোনো ধরনের নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (তথ্য গোপন রাখার চুক্তি) সই করেছেন— এমন দাবিও উড়িয়ে দিয়েছে তারা।
