‘বিশ্বাস রাখো’: উরুগুয়ের সঙ্গে ড্রয়ের আগে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মা
বাবা দিবসে ভোজিনহার ম্যাচ দেখলেন তার মা।
রোববার রাতে কেপ ভার্দে ও উরুগুয়ের মধ্যকার ২-২ গোলের ড্র ম্যাচটি দেখতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ৬৪ হাজার ৩ জন দর্শক। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প ছিল কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার মা আনা কান্দিদা এভোরার।
এভোরা শুক্রবার মিয়ামিতে পৌঁছান ও সপ্তাহের শেষে ছেলের দেখা পান এবং রোববার মিয়ামি স্টেডিয়ামের একটি বিশেষ কক্ষ থেকে ম্যাচটি উপভোগ করেন। রূপকথার মতো এগিয়ে চলা কেপ ভার্দের এখন নকআউট পর্বে ওঠার সুযোগ রয়েছে, যা অনেকটাই নির্ভর করছে সৌদি আরবের বিপক্ষে তাদের গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচের ফলাফলের ওপর।
কেপ ভার্দে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া গল্পগুলোর একটি। ছোট্ট এই দ্বীপরাষ্ট্র দুটি ম্যাচ খেলেই দুটি ড্র করেছে। ভোজিনহা—যার প্রকৃত নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস—রোববার গ্যালারিতে মাকে পেয়েছিলেন। তবে ভিসা না পাওয়ায় কেপ ভার্দের স্পেনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটি দেখতে ভোজিনহার মা আসতে পারেননি।
আর জয় না পেলেও—এমনকি ৪০ বছর বয়সী তার ছেলে ম্যাচটিতে একটি সেভ না করলেও—মায়ের উপস্থিতি কেপ ভার্দের গল্পকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। ম্যাচ শেষে তিনি দেশের পতাকা উড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, যখন তার ছেলে মাঠ থেকে সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছিলেন।
ভোজিনহা বলেন, 'আমাদের অনেক মানুষ খুব কঠোর পরিশ্রম করছেন।'
একজন গোলরক্ষকের কার্যকর হতে সব সময় সেভ করতেই হবে এমন নয়। ম্যাচে ভোজিনহার সেরা দুটি মুহূর্ত হয়তো পরিসংখ্যানের খাতায়ও ধরা পড়বে না। শেষদিকে উরুগুয়ের দুটি আক্রমণের সময় তিনি নিখুঁত অবস্থানে ছিলেন, শট নেওয়ার কোণ সংকুচিত করে প্রতিপক্ষকে খুবই কঠিন জায়গায় বল পাঠাতে বাধ্য করেছিলেন। দুটি শটই গোলবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায় এবং দুইবারই ভোজিনহাকে গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দেখা যায়।
ম্যাচের আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তায় এভোরা বলেন, 'আমি সব সমর্থককে এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় যারা সহায়তা করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশেষ করে দলকে এবং কাবো ভার্দেকে যে সমর্থন দিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা সবাই চাই কাবো ভার্দে ভালো খেলুক, মাঠে নিজেদের উজ্জ্বলভাবে তুলে ধরুক। খেলোয়াড়দের বিশ্বাস রাখতে হবে, তাহলেই সবকিছু ভালো হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'মাথা উঁচু করে রাখো, মাঠে নেমে গোলের জন্য লড়াই করো, তাহলে তোমরা দারুণ খেলবে, আমার ছেলেরা। তোমাদের জন্য ভালোবাসা রইল। শক্ত থেকো, সাহসী থেকো। নীল হাঙরেরা!'
পর্তুগিজ ভাষায় দলটিকে সাধারণত 'তুবারোয়েস আজুইস' নামে ডাকা হয়, যার বাংলা অর্থ 'নীল হাঙর'।
রোববার এভোরা কাবো ভার্দের একটি পতাকা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন। তার পোশাকের পেছনে ছিল ছেলের নাম ও জার্সি নম্বর। পরে তাকে একটি বিশেষ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখান থেকে তিনি ম্যাচটি দেখেন। ওয়ার্মআপের সময় বড় পর্দায় ভোজিনহার ছবি দেখানো হলে দর্শকদের গর্জন তিনি শুনতে পান, যদিও স্টেডিয়ামের অধিকাংশ দর্শক উরুগুয়ের সমর্থক ছিলেন। খেলোয়াড়দের নাম ঘোষণার সময়ও সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে জোরালো করতালি পেয়েছিলেন।
এভোরার ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা—বিশেষ করে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়ের বিষয়টি—সমাধান হয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা এবং কেপ ভার্দের ফুটবল ফেডারেশনের যৌথ প্রচেষ্টার ফলে। তাদের সহযোগিতাতেই এভোরার মিয়ামি যাওয়ার পথ সুগম হয়। কেপ ভার্দে থেকে ২৪ ঘণ্টারও বেশি ভ্রমণ শেষে তিনি শুক্রবার বিকেলে মিয়ামিতে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নামার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থার কর্মকর্তা ও স্বেচ্ছাসেবকেরা তাকে ঘিরে স্বাগত জানান।
কর্মকর্তারা জানান, সপ্তাহান্তে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা তাকে সংস্থাটির ফ্লোরিডাভিত্তিক টুর্নামেন্ট সদর দপ্তরেও নিয়ে যায়।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোজিনহার অনুসারী ছিল প্রায় ৫০ হাজার। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে কেপ ভার্দেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের নজর কাড়েন। ফলে রোববারের ম্যাচ শুরুর সময় তার অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৫০ লাখে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, তার প্রয়াত দাদা-দাদি যদি তাকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখতে পারতেন! একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, মায়ের ভিসা সমস্যার সমাধান হয়নি বলে তিনি ম্যাচটি দেখতে আসতে পারেননি। এই আবেগঘন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এভোরাকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য নানা উদ্যোগ শুরু হয়।
আর এই ড্র ম্যাচ, সঙ্গে একজন গোলরক্ষক ও তার মায়ের গল্প, কেপ ভার্দের ফুটবল দলের ওপর এমন আলো ফেলেছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। শুক্রবার হিউস্টনে সৌদি আরবের বিপক্ষে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অপেক্ষা করছে। কেপ ভার্দে যদি পরবর্তী পর্বে উঠতে পারে, তবে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে তারা আবারও মিয়ামি গার্ডেন্সে ফিরতে পারে। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হতে পারে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা, যারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার পিকো লোপেস বলেন, 'আপনি যখন কোনো কিছুর স্বপ্ন দেখেন, তখন সেই স্বপ্ন সত্যিও হতে পারে।'
