আন্তর্জাতিক ফুটবলে রাশিয়া, ইসরায়েলকে নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে ফিফা সভাপতি; ট্রাম্পের শান্তি পুরস্কারের পক্ষে অবস্থান
আন্তর্জাতিক ফুটবলে রাশিয়া ও ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। একই সঙ্গে তিনি গত ডিসেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এর ইউরোপীয় সহযোগী সংস্থা উয়েফা রাশিয়ার জাতীয় দলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করে। অন্যদিকে গাজায় চলমান সংঘাত এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনে ইসরায়েলের সমর্থনের কারণে দেশটির ওপরও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানানো হয়েছে ফিফা ও উয়েফার কাছে।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি। তবে ইনফান্তিনোর দাবি, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে 'কাজের কাজ কিছুই হয়নি'। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আর না দেওয়া হয়, সে জন্য ফিফার বিধিমালা পরিবর্তনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিচ্ছেন তিনি।
স্কাই নিউজের 'দ্য ওয়ার্ল্ড' অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ইয়ালদা হাকিমের সঙ্গে এক ঘণ্টার দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইনফান্তিনো। সাক্ষাৎকারটি সোমবার বিকেলে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের উপায় খোঁজা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ফিফা সভাপতি বলেন, 'আমাদের তা করতেই হবে। অবশ্যই। কারণ এই নিষেধাজ্ঞা কোনো ফলাফল বয়ে আনেনি, এটি কেবল আরও হতাশা ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে।'
জাতীয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা বন্ধ করতে ফিফার বিধিমালা পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ইনফান্তিনো বলেন, 'রাজনৈতিক নেতাদের কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো দেশকে কখনোই ফুটবল খেলা থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত নয়।'
২০২৩ সালে ফিফা ও উয়েফা রাশিয়ার পুরুষ ও নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দলগুলোর ওপর থেকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। তবে শর্ত ছিল, দলগুলোকে 'ফুটবল ইউনিয়ন অব রাশিয়া' নামে অংশ নিতে হবে এবং জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় দলের কিট বা সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাবে না। তাদের খেলতে হবে নিরপেক্ষ রঙের পোশাকে।
গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফিফা ও উয়েফার কাছে একটি খোলা চিঠি দেয়। সেখানে 'অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলের বসতিগুলোর ক্লাবগুলোকে লিগ থেকে না সরানো পর্যন্ত ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে সাময়িক বরখাস্ত' করার আহ্বান জানানো হয়।
চিঠিতে আরও বলা হয়, 'ফুটবলকে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে আলাদা করা যায় না'। তবে ইনফান্তিনো স্কাই নিউজকে বলেন, ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে 'একটি পরাজয়'।
সাক্ষাৎকারে আরও বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেন ফিফা সভাপতি। এর মধ্যে ডিসেম্বরের শুরুতে ওয়াশিংটনে পুরুষদের বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।
পুরস্কারটি নিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, 'বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করতে আমাদের যা যা করা সম্ভব, তা করা উচিত। এই কারণেই আমরা কিছু সময় ধরে ভাবছিলাম, যারা শান্তির জন্য কিছু করছেন, তাদের পুরস্কৃত করা উচিত কি না।' এরপর তিনি বলেন, 'বস্তুনিষ্ঠভাবে বিচার করলে, তিনি এটির যোগ্য।'
তিনি আরও বলেন, 'এটি কেবল জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কথা নয়। একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীও এ কথা বলেছেন। সংঘাত নিরসন এবং হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।'
ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো ১৫ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের সময় তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি ট্রাম্পকে উপহার দেন। সে সময় তিনি বলেন, এটি ছিল 'আমাদের স্বাধীনতার প্রতি তার অনন্য অঙ্গীকারের স্বীকৃতি'।
এর কয়েক সপ্তাহ আগেই ট্রাম্প কারাকাসে একটি সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার নির্দেশ দেন। পরে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয় এবং মাদক পাচারের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
গ্রিনল্যান্ড আক্রমণ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং তার অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে চলতি বছরের বিশ্বকাপ বয়কটের যে আহ্বান জানানো হয়েছে, সে বিষয়েও ইনফান্তিনোকে প্রশ্ন করা হয়।
জবাবে ফিফা সভাপতি বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বলেন, কেউ তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পরামর্শ দেয়নি। তাঁর প্রশ্ন, তাহলে ফুটবলের ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন আচরণ করা হবে?
ইনফান্তিনো বলেন, 'আমি মনে করি, আমাদের এই বিভক্ত ও আগ্রাসী পৃথিবীতে এমন কিছু উপলক্ষ প্রয়োজন, যেখানে মানুষ একত্রিত হতে পারে এবং ফুটবলের প্রতি আবেগকে ঘিরে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতে পারে।'
