আগামী দুই বছর নিয়ে আমার আশঙ্কা: পল ক্রুগম্যান
১৯৪৫ সালের মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অ্যাডলফ হিটলারও বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধে পরাজয় অনিবার্য। সোভিয়েত বাহিনী বার্লিন থেকে মাত্র ৪৫ মাইল দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। মার্কিন বাহিনী রাইন নদী পার হয়ে জার্মানির অবশিষ্ট প্রতিরক্ষাবাহিনীকে ঘিরে ফেলার পথে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হিটলার বিশ্বাস করতেন না যে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। বরং তার বিশ্বাস ছিল, জার্মান জনগণই তাকে ব্যর্থ করেছে।
এ কারণে ১৯ মার্চ তিনি 'রাইখের ভূখণ্ডে ধ্বংসযজ্ঞ-সংক্রান্ত ডিক্রি' জারি করেন। এটি পরে 'নেরোবেফেল' বা 'নেরো ডিক্রি' নামে পরিচিতি পায়। ডিক্রিতে জার্মানির নিজস্ব অবকাঠামো ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কথিত উদ্দেশ্য ছিল, মিত্রবাহিনী যেন ওই অবকাঠামো ব্যবহার করতে না পারে। কিন্তু এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্টতই নিজের দেশকেই শাস্তি দেওয়া।
সৌভাগ্যবশত, আলবার্ট স্পিয়ারসহ নাৎসি সরকারের অন্য কর্মকর্তারা সেই নির্দেশ কার্যকর করেননি। যদিও তারা কী করছেন—বা করছেন না—সে বিষয়ে হিটলারকে সম্ভবত কিছুই জানাননি।
কেন আমি ইতিহাসের এই ঘটনা তুলে ধরছি? স্পষ্টতই, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে ভাবছি বলে।
সব লক্ষণই বলছে, নির্বাচনে রিপাবলিকানরা বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। ট্রাম্প নিজেই ইচ্ছাকৃতভাবে এই নির্বাচনকে নিজের ওপর গণভোটে পরিণত করেছেন। তার বক্তব্য, 'মাগা সমর্থকেরা, এমন ভান করো যেন ব্যালটে আমিই প্রার্থী।' তাহলে আমেরিকানরা যখন তাদের সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা প্রকাশ করবেন, তখন ট্রাম্প কী করবেন?
অবশ্যই তিনি দাবি করবেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে এবং ফলাফল উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু ধরে নেওয়া যাক, সে চেষ্টায় তিনি ব্যর্থ হলেন। তারপর কী?
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে, কিন্তু কোনোভাবেই তা পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, আমেরিকা তো বটেই, দেশটির মিত্রদেরও ব্যাপক ক্ষতি করার বিপুল ক্ষমতা তার হাতে থেকে যাবে।
গত কয়েক দিনে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে কোনো আগাম সতর্কবার্তা পায়নি ইউক্রেন। এর পেছনে কারিগরি সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প তার বন্ধু ভ্লাদিমির পুতিনকে বিজয়ী হতে না দেওয়ার সাহস দেখানোয় ইউক্রেনকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন—এ সম্ভাবনা যারা উড়িয়ে দিচ্ছেন, তাদের গত দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই বলে মনে হয়।
নিজ দেশের ভেতরেও ট্রাম্পের কর্মকর্তারা হঠাৎ ওয়াশিংটনের একটি সরকারি গলফ কোর্সে শত শত গাছ কেটে ফেলেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প নিজের পছন্দমতো ওই গলফ কোর্সটির রূপ বদলাতে চেয়েছেন। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর যা-ই হোক, গাছগুলো ধ্বংস করার জন্য এত তাড়াহুড়োরও কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রতিহিংসামূলক কাজ, ইচ্ছাকৃত ভাঙচুর—যা করা হয়েছে ঠিক এ কারণেই যে ট্রাম্প জানেন, তিনি যা চান, তা আর করতে পারবেন না।
কয়েক শ গাছ কেটে ফেলা হয়তো তেমন বড় কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু এর মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তার একটা চিত্র ফুটে উঠেছে।
কেনেডি সেন্টারের কথা ভাবুন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ট্রাম্প নিজের নাম সেখানে যুক্ত করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। আগামী দুই বছরে আমেরিকার সঙ্গে কী ঘটতে পারে, তার আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে এই কেনেডি সেন্টার।
আসন্ন এই ধ্বংসযজ্ঞের শাসন ঠেকাতে পারবেন কি ডেমোক্র্যাটরা? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সুপ্রিম কোর্টের একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলীয় স্বার্থে পরিচালিত সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ 'একক নির্বাহী' তত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে ট্রাম্পকে বিপুল ও প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা দিয়েছে। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে এ কারণে যে, ট্রাম্পের চারপাশে এমন একদল অনুগত অনুচর রয়েছেন, যাদের অনেককেই কংগ্রেসের নতজানু রিপাবলিকানরা অনুমোদন দিয়েছেন। তারা আইন ভাঙতে প্রস্তুত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আইন ভাঙতে আগ্রহীও। এ ছাড়া বিপুল সম্পদের অধিকারী অলিগার্করাও তার পাশে রয়েছেন। রাজনৈতিক খাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের ব্যয়ও যদি এই নির্বাচনে জয় কিনে দিতে না পারে, তবু তারা গণতন্ত্রের ওপর ট্রাম্পের আক্রমণকে সমর্থন দিয়ে যাবেন।
তবে ডেমোক্র্যাটরা একটি কাজ করতে পারেন। তারা স্পষ্ট করে দিতে পারেন, ট্রাম্পের এই নিরো-সুলভ ধ্বংসযজ্ঞে যারা সহায়তা করছেন এবং তাকে উৎসাহ দিচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককে আইনের সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব এবং আনা হবে।
এই মুহূর্তে যারা বলছেন, 'আমাদের অতীতের দিকে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত', তারা আসলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছেন, যেখানে ভবিষ্যতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট থাকার সম্ভাবনাই অনেক কমে যাচ্ছে।
পল ক্রুগম্যান একজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ এবং নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট সেন্টারের অর্থনীতির অধ্যাপক। তিনি ২০০৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। মতামতটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
