আরসিইপি: দরজা খুলছে, কিন্তু ঘর কি প্রস্তুত?
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৫ দেশের বাণিজ্য জোট আরসিইপিতে বাংলাদেশ, চিলি, শ্রীলঙ্কা ও হংকং যোগ দেওয়ার আবেদন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর ম্যানিলায় আরসিইপির যৌথ কমিটির বৈঠকে আবেদনকারী দেশগুলোর বিষয়ে বিশেষ কার্যদল গঠনের সুপারিশ করা হয়। পরে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম আরসিইপি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সেই সুপারিশ অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এটিকে সদস্যপদের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং সামনে শুরু হচ্ছে কঠিন প্রস্তুতি ও দর-কষাকষির পর্ব।
আরসিইপিতে যোগ দিতে পারলে বাংলাদেশের সামনে নতুন বাজার, আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রবেশ এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধার একটি অংশ হারানোর প্রেক্ষাপটে এশিয়ার বড় বাজারগুলোর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বাণিজ্যসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কিন্তু একটি বড় ভুল হবে যদি আমরা শুধু বাজারের আকার দেখি, প্রতিযোগিতার মাত্রা না দেখি। আরসিইপি বাজার খুলবে বাংলাদেশের জন্য; একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারও খুলতে হবে সদস্যদেশগুলোর জন্য। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানের প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তখন আরও সহজে বাংলাদেশের বাজারে ঢুকতে পারে। দুর্বল উৎপাদনশীলতা ও উচ্চ ব্যয়ের দেশীয় শিল্পের জন্য সেটি কঠিন পরীক্ষা।
বাংলাদেশের আসল সমস্যা তাই আরসিইপিতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া নয়; সমস্যা হলো প্রবেশের পর প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা তৈরি করা। রপ্তানি এখনো অতিরিক্তভাবে তৈরি পোশাকনির্ভর। একটি অকার্যকর বাণিজ্যনীতি, বন্দর ও কাস্টমসের অদক্ষতা, লজিস্টিক ব্যয়, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, জটিল করব্যবস্থা, প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার এবং দক্ষতার ঘাটতি—সবই প্রতিযোগিতার পথে বাধা।
সংস্কারের তালিকায় তাই বাণিজ্যনীতির সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উচ্চ শুল্কের পাশাপাশি প্যারাট্যারিফ—যেমন সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও অন্যান্য আমদানি-সংক্রান্ত চার্জ—কমিয়ে একটি স্বচ্ছ, সরল ও পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ককাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে কাস্টমস ও বন্দরব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে, সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমাতে হবে এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষতা, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও আইসিটির মতো খাতে রপ্তানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
আরসিইপি শুধু পণ্যবাণিজ্যের চুক্তি নয়; এর বৃহত্তর লক্ষ্য সেবা ও বিনিয়োগের আঞ্চলিক একীভূতকরণ। ফলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ শুধু পণ্য রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ নয়। আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। জমি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নিশ্চয়তা, করব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতা, মুনাফা ও মূলধন প্রত্যাবাসনের স্বচ্ছতা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়—এসব ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া আঞ্চলিক উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন কঠিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দর-কষাকষিতে আবেগ নয়, তথ্য হতে হবে ভিত্তি। কোন পণ্যে দ্রুত শুল্কসুবিধা দরকার, কোন খাতে দীর্ঘ রূপান্তরকাল প্রয়োজন এবং দেশীয় শিল্পকে কীভাবে সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া যায়—এসব বিষয়ে প্রস্তুতি ছাড়া বাণিজ্যচুক্তি উল্টো চাপ তৈরি করতে পারে।
আরসিইপি তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন বাজারের দরজা নয়; এটি সক্ষমতার পরীক্ষা। দরজা খুলছে—কিন্তু তার ওপারে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করার মতো করে ঘর গোছানো হয়েছে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ড. সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক। মতামতটি লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
