করদাতা কি ব্যাংকের সংকটেরও কর দেবেন?
বাংলাদেশের অনেক করদাতার জন্য প্রশ্নটি এখন আর তাত্ত্বিক নয়; এটি বাস্তব জীবনের এক কঠিন আর্থিক বাস্তবতা। বিশেষ করে যেসব দুর্বল বা তারল্য-সংকটে থাকা ব্যাংকে মানুষের আমানত রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি একই সাথে অস্বস্তিকর ও বাস্তব আর্থিক সংকটের এক কঠিন প্রতিচ্ছবি।
ব্যাংকের হিসাবে সুদ বা মুনাফা জমা হলেও যদি আমানতকারী বাস্তবে সেই টাকা উত্তোলন বা গ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে ওই প্রকৃতপক্ষে প্রাপ্ত না হওয়া সুদ বা মুনাফার ওপর নির্ধারিত করদায় করদাতাগণ কীভাবে পরিশোধ করবেন?
বিষয়টি নিছক হিসাবের নয়; এটি এখন কর ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের প্রশ্ন।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৬২ অনুযায়ী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানত থেকে অর্জিত সুদ বা মুনাফা আর্থিক সম্পদ থেকে আয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ধারা ৬৩-তে সংশ্লিষ্ট হিসাবে আয় জমা বা প্রাপ্তির সময় বিবেচনার বিধান রয়েছে। ফলে হিসাবভুক্ত সুদ বা মুনাফা রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত না করলে করদাতা আইনগত ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। [আয়কর আইন, ২০২৩—জাতীয় রাজস্ব বোর্ড]
কিন্তু বাস্তবতা সব সময় হিসাবের খাতার মতো সরল নয়। বেশ কিছু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক আর্থিক দুর্বলতা ও দীর্ঘস্থায়ী তারল্য সংকট ভুক্তভোগী আমানতকারীদের দেখিয়েছে যে ব্যাংকের হিসাবে থাকা অর্থ এবং তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারযোগ্য অর্থ এক জিনিস নয়।
ধরা যাক, একজন করদাতার হিসাবে এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মেয়াদান্তে ১২ লক্ষ টাকা মুনাফা অর্জন করলেন এবং এই আয়ের ওপর এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা উৎস কর কর্তন হলো। কিন্তু ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে তিনি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সেই অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। তবুও রিটার্নে ওই আয় যোগ করার ফলে যদি তিনি উচ্চতর করস্তরে চলে যান, তাহলে উৎসে কর্তিত করের পরও অতিরিক্ত করদায় তৈরি হয়।
আয়কর ব্যবস্থা আয় নির্ধারণের ওপর ভিত্তি করে কর আরোপ করে। কিন্তু করদাতার কর পরিশোধের সক্ষমতা শেষ পর্যন্ত তার বাস্তব নগদ প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত আমানতকারী কিংবা ব্যাংকের সুদ বা মুনাফার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও তীব্র। করদাতার ব্যাংক হিসাবে আয় আছে, কিন্তু সেই আয় যদি ব্যবহারযোগ্য নগদ অর্থে পরিণত না হয়, তাহলে কর পরিশোধের অর্থ তিনি কোথা থেকে পাবেন?
এখানেই মূল সংকট!
আয় আছে কাগজে, কিন্তু কর দেওয়ার টাকা নেই বাস্তবে। করদাতাকে তখন নিজের সঞ্চয় ভাঙতে, অন্যের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা অন্য সম্পদ বিক্রি করে কর পরিশোধ করতে হবে শুধুমাত্র কাগজে মুনাফা আয়ের জন্য (Paper Profit)।
প্রশ্ন হলো, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকটের আর্থিক বোঝা কি করদাতার ব্যক্তিগত সম্পদের ওপরও এসে পড়বে?
এটি কোনো করদাতাকে আয় গোপনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবনা নয়। বরং এর বিপরীত—আয় সম্পূর্ণ প্রকাশ করেই প্রকৃত অপ্রাপ্যতার জন্য আইনসম্মত প্রতিকারের দাবি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ও অভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া। রিটার্নে হিসাবভুক্ত কিন্তু বাস্তবে উত্তোলন-অযোগ্য সুদ বা মুনাফা পৃথকভাবে প্রকাশের সুযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নথি ও উত্তোলন-সীমাবদ্ধতার প্রমাণ সংরক্ষণ এবং পরবর্তীতে আয়টি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে অনাদায়ী হলে পূর্বে পরিশোধিত করের আইনসম্মত সমন্বয়—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন।
বিশেষ করে উৎসে করের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক একদিকে সুদের ওপর উৎসে কর কেটে রাখছে; অন্যদিকে একই সুদ রিটার্নে যোগ হয়ে করদাতার মোট করদায় অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। অথচ মূল অর্থই যদি বাস্তবে পাওয়া না যায়, তাহলে করদাতার ওপর সৃষ্ট অতিরিক্ত নগদ করভার একটি গুরুতর তারল্য সংকট তৈরি করতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তীতে যদি ব্যাংক ওই সুদ বা মুনাফা পরিশোধে ব্যর্থ হয়, তাহলে পূর্ববর্তী বছরে প্রদর্শিত আয় ও পরিশোধিত করের কী হবে? একই আয়ের ওপর ভবিষ্যতে পুনরায় কর আরোপের ঝুঁকি কীভাবে বন্ধ হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অস্পষ্ট থাকলে ভবিষ্যতে করদাতা ও কর কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষই বিরোধ, নিরীক্ষা ও কর-জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন।
সুতরাং প্রয়োজন কিছু পদক্ষেপ:
হিসাবভুক্ত আয় → স্বচ্ছভাবে রিটার্নে প্রকাশ → অপ্রাপ্যতার প্রমাণ → কর নির্ধারণ → পরবর্তীতে প্রকৃত অনাদায়ী হলে আইনসম্মত কর-সমন্বয়।
০১. ব্যাংকের তারল্য সংকটের কারণে অ-উত্তোলনযোগ্য সুদ/মুনাফার সার্টিফিকেট আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা যেতে পারে।
০২. আমানতকারীর সম্মতিক্রমে এনবিআর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসমূহের কাছ থেকে সরাসরি করদায় আদায়ের ব্যবস্থা করতে পারে।
০৩. এনবিআর পৃথক স্পেশাল ডেস্ক/অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব আমানতকারী করদাতার আয়কর রিটার্ন গ্রহণ করতে পারে এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে করদায় নির্ধারণ, আদায় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
এতে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হবে না; বরং সৎ করদাতার অধিকার সুরক্ষিত হবে এবং কর প্রশাসনের জন্যও অভিন্ন প্রয়োগ নিশ্চিত হবে।
একজন সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকের আর্থিক সংকট সৃষ্টি করেননি। তিনি যদি আইন মেনে আয় প্রকাশ করেন, তবে ব্যাংকের অক্ষমতার কারণে সেই আয় বাস্তবে না পাওয়ার ঝুঁকিও একতরফাভাবে তার ওপর চাপানো ন্যায়সংগত হতে পারে না।
কর আদায় রাষ্ট্রের অধিকার; কিন্তু এমন অর্থের ওপর কর আরোপের পর সেই অর্থ অনাদায়ী হয়ে গেলে করদাতার প্রতিকার নিশ্চিত করাও কর ন্যায়বিচারের অংশ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুবই সরল—
ব্যাংকের খাতায় টাকা আছে, কিন্তু ব্যাংক যদি সেই টাকা না দেয়—তাহলে সেই টাকার কারণে বাড়তি করের টাকা দেবেন কে?
লেখক: ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিশনার,
মেইল: ashishghosh382@gmail.com
