হামে শিশুর মৃত্যু: এসব মৃত্যুর জন্য তাহলে কেউ দায়ী নয়!
ভোলার ৫ মাস বয়সী তাকরিম, চাঁদপুরের তাজিম এবং আরো চারশোরও বেশি শিশু মা-বাবার কোল থেকে হারিয়ে গেল। এইভাবে হয়তো আরো অনেকেই হারিয়ে যাবে, হয়তো আমরা আর হিসাবও রাখবো না। যে মা-বাবা, বা যে পরিবার তাদের বুকের ধন হারিয়েছেন, একমাত্র তারাই সারাটা জীবন ধরে এই কষ্ট বুকে বয়ে বেড়াবেন। তাদের জীবন, সংসার, আশা, হাসি, আনন্দ সব নিয়ে চলে গেছে স্বর্গের সেই যাদুকররা।
কত সাগর, নদী পার হয়ে বাবা-মায়ের কোলে এসেছিল যে শিশু যাদুকর, তাকে মনে হতো রূপকথা। মমতা মাখা ছোট দুটি হাত, আধো আধো বোল, মুখের মিষ্টি হাসি, ছোট দুই পায়ে হেলেদুলে হাঁটা সব স্মৃতি হয়ে গেল। কপালের নজরকাটা টিপ বা নয়নের কাজল বাচ্চাগুলোকে রক্ষা করতে পারেনি। যেভাবে এরা মায়ের কোল আলো করে স্বর্গ থেকে এসেছিল, এর চাইতে অনেক বেশি কষ্ট রেখে তারা সেই স্বর্গেই ফিরে গেল।
বিষণ্ন বাবা-মাকে রেখে গেল একা, ঘরের কোণে। এই ঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের স্মৃতি, খেলনা, কাপড়, কাঁথা-বালিশ, বেলুন, দুধের বোতল এবং আরো কত কী। সন্তানের নাম আর নামের সাথে রইলো শুধু স্মৃতিটুকু। এই হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতি বুকে মা-বাবা জেগে থাকবেন।
বিয়ের ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম যখন প্রথম তাজিমের মুখ দেখেছিলেন, তখন তিনি ভেবেছিলেন আকাশের চাঁদ এখন তার ঘরে এসে আলো জ্বালিয়েছে। মাত্র ৮ মাস ১৮ দিন সেই আলোয় ঘর ভরে ছিল। তারপর এক ফুৎকারে নিভে গেল সেই আলো।
ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির এই সন্তানের জন্ম হয়েছিল টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতিতে। পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিও ছিল অনেক। কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে তারা নিরাপদে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের জন্মের পর তাজিমকে নিয়ে তারা যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল কিছু মানুষের বর্বর সিদ্ধান্তে।
প্রথমে নিউমোনিয়া, পাতলা পায়খানা শুরু হয়, তারপর হাম। চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু না সব শেষ হয়ে গেল। এইভাবে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু তাও তারা থামেননি, শুধু চেয়েছিলেন সন্তান ফিরে আসুক।
একইভাবে তিন হাসপাতাল ঘুরে ৫ মাস বয়সী তাকরিমের মরদেহ নিয়ে বাসায় ফিরেছেন মা-বাবা। শুধু তাকরিম ও তাজিম একা নয়, বাংলাদেশে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত হামের প্রাদুর্ভাবে ৪১৫ জন শিশু মারা গেছে। ৪৯ হাজারেরও বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্তের সংখ্যা এর চাইতেও অনেক বেশি। অধিকাংশ রোগী ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশে এই পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, কিন্তু আমাদের তেমন বিকার নাই।
এরকম অসংখ্য মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী আমরা। তাজিমের মা ফারজানা ফেসবুকে যা লিখেছেন, সেটাই আসলে সন্তান হারানো সব মা-বাবার মনের কথা। তিনি লিখেছেন, 'দুই মাস ধরে নিষ্পাপ শিশুরা মরে যাচ্ছে, এ নিয়ে সংসদে আলাপ নেই। কারও কোনো দায় নেই। কেউ ব্যর্থতা স্বীকার করছে না। সব দোষ মা ও শিশুর। শিশুরা এই দেশে জন্ম নিল কেন? মা সন্তানের জন্ম দিল কেন?'
তাজিমের মায়ের কথাই ঠিক হলো, কারণ কেউই শিশু মৃত্যুর দায় নিতে চাইছেন না। এমনকি যে অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি দায়ী বলে বিভিন্ন পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা কানে তুলো ও পিঠে কুলো বেঁধে চুপচাপ ঘটনা দেখছেন। নূন্যতম দু:খ প্রকাশও করেন নাই।
উপরন্তু সেই সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ নির্লজ্জভাবে বলে দিয়েছেন হামের টিকার দায় অন্তবর্তী সরকার নেবে না। ইতোমধ্যে দেশে তাদের সরকার অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা ও হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে হামের প্রকোপে ৪০০ এর বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এতবড় একজন অর্থনীতিবিদ হয়েও কীভাবে এই মিথ্যাচারিতা করছেন, কেন করছেন?
আমাদের সরকারি ও বিরোধী দল কেউই ইউনূস প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে যে অসংখ্য শিশু মারা গেছে, সেসব নিয়ে আলোচনা করতে নারাজ। তারা কেউই ইউনূস প্রশাসনকে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইছেন না।
বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী একেকবার একেকজনকে দায়ী করছেন। সোমবার উনি সরাসরি বলেছেন, হামে মৃত্যুর জন্য হাসিনা সরকার দায়ী। অথচ আমাদের জানা মতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে হামমুক্ত হওয়ার কথা ছিল। হামে শিশু মৃত্যু ঠেকানোর জন্য যতোটা না কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে, তার চাইতে বেশি চলছে হাসিনা সরকারের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে সরকার দেশজুড়ে টিকার ক্যাম্পেইন শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে সব শিশু টিকার আওতায় আসছে না। টিকাদান পরিস্থিতি দ্রুত যাচাই পদ্ধতি (আরসিএম) থেকে ইউনিসেফ বলছে, এখনো শহর এলাকায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি।
প্রান্তিক ও দুর্গম এলাকার শিশু, নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু, বস্তিবাসী শিশু, পথে থাকা শিশু, ভবঘুরে মায়ের সন্তানদের কত শতাংশ ঠিক টিকার আওতায় আসবে তা বলা কঠিন। অনেক পরিবার জানেই না যে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং কোথায় টিকা দেয়া হচ্ছে।
আমাদের দেশের মানুষ অনেকেই অসচেতন এবং নিরক্ষর। অতীতকাল থেকেই দেখেছি টিকা নিয়ে ভুল ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে বাবা-মায়েদের ভয় পাইয়ে দেয়া হতো। পরে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে দেশের প্রায় সব শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
গত দুইবছরে টিকার ব্যাপারে, প্রচার-প্রচারণার ব্যাপারে আবার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মানুষের মধ্যে বিশেষ করে পড়াশোনা না জানা মানুষের মনে দ্বিধা ও ভয় কাজ করে। গত দুইবছর টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এক শ্রেণির কূপমণ্ডূক মানুষ আবার নেমে পড়েছে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর কাজে। অনেকের মধ্যে একজন অভিভাবক বলেছেন, 'মুঠোফোনে কিছু ভিডিও দেখে তিনি টিকার বিষয়ে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। তাই মেয়েকে টিকা দেননি।' (প্রথম আলো)।
আগে ৯ মাস বয়সীদের টিকা দেওয়া হতো, এখন বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। এতে শিশুর ক্ষতি হবে কি না, তা নিয়ে মায়েদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এই দ্বিধা ও ভ্রান্ত ধারণা আগেও ছিল, যেমন—সুমাইয়া বেগম মনে করেন, টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। সে জন্য নিজের দেড় বছর বয়সী ও চার বছর বয়সী দুই সন্তানকে টিকা দেননি। (প্রথম আলো)।
টিকা নেয়াটা জরুরি এবং এর যে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, এটা বুঝানোর জন্য দরকার স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মায়েদের মুখোমুখি যোগাযোগ। সেটি খুব জোরালোভাবে শুরু করতে হবে এবং তা এখনই। সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে, হাম নিজে শুধু 'ফুসকুড়ির রোগ' নয়; দুর্বল ও অপুষ্ট শিশুর শরীরে এটি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই সময়মতো দুই ডোজ টিকা নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা।
"আপনার শিশুকে টিকা দিন। আপনার পাড়ায় বিভিন্ন জায়গায় টিকা দেয়া হচ্ছে" — এই প্রচারণা জোরালোভাবে চালাতে হবে। সারাদিন গণমাধ্যমে ও সামাজিকমাধ্যমে প্রচার চালানো দরকার। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা দরকার। অনেক পরিবার প্রথমে হামকে 'সাধারণ ফুসকুড়ি' ভেবে অবহেলা করে। কিন্তু শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা বা খিঁচুনি শুরু হলে অবস্থা গুরুতর হয়ে যায়।
দেশের অনেক হাসপাতাল এইসব জটিল রোগীকে সেভাবে সাপোর্ট দিতে পারে না। অভিভাবকদের জানতে হবে টিকা দুই ডোজ না নিলে পূর্ণ সুরক্ষা হয় না। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে হবে। হাম যেহেতু বাতাসে ছড়ায়। কাজেই আক্রান্ত শিশুকে অন্তত সপ্তাহখানেক আলাদা রাখা দরকার।
ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে যে, কী কী লক্ষণ থাকলে দেরি না করে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে। যেমন—শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা, খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঝিমুনি, ঠোঁট নীল হওয়া ও তীব্র ডায়রিয়া এবং পানিশূন্যতা সৃষ্টি হলে।
বাংলাদেশে হামে শিশু মৃত্যু পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার পেছনে অনেক কারণ একসাথে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো হাম খুবই সংক্রামক ভাইরাস। একটি আক্রান্ত শিশু সহজেই ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।
যখন টিকাদানের কভারেজ কমে যায়, তখন দ্রুত বড় আকারের প্রাদুর্ভাব হয়। অথচ অভিভাবকদের অধিকাংশই এই বিষয়ে সচেতন নন। তারা বাচ্চাদের নিয়ে ভীড়ের মধ্যে যাচ্ছেন, বাজার করছেন, মাস্ক পরাচ্ছেন না। এমনকি বাচ্চার গায়ে র্যাশ বের হলেও স্কুলে পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে।
শিশুর অপুষ্টি ও ভিটামিন এ এর ঘাটতি হাম ছড়ানোর আরেকটি কারণ। অপুষ্ট শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে হাম নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিকের সংক্রমণ ইত্যাদিতে রূপ নেয়।
বাংলাদেশে এখনও বিপুল সংখ্যক শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। শহর, বস্তি, আশ্রয়কেন্দ্র বা দরিদ্র এলাকায় এক শিশু আক্রান্ত হলে খুব দ্রুত বহু শিশু আক্রান্ত হয়। গত দুইবছরে ভিটামিন এ-ও পায়নি শিশুরা। তাই পুষ্টির ঘাটতিতেও হামে মৃত্যু বাড়ছে।
কেন ছয় মাস বয়সীরা টিকা নেবে, তা মানুষকে নতুন করে বোঝানো দরকার। সবাই সচেতন না হলে, সব শিশু টিকার আওতায় আসবে না। টিকাদানকে উৎসবে পরিণত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি দরকার গুজব এড়িয়ে চলা।
'হামের টিকা ক্ষতিকর' বা 'টিকা দিলে অসুখ বাড়ে' এ ধরনের তথ্য বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকা। সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার জন্য সবপক্ষকে একসাথে কাজ করতে হবে, বিশেষ করে সরকারকে। সরকারকেই সমন্বয়কের দায়িত্ব নিতে হবে।
সবকিছু বাদ দিয়ে সরকারকে হাম ইস্যুতে সিরিয়াস হতে হবে। প্রতিটি উপজেলা ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে আইসিউ বাড়াতে হবে, আইসোলেশন ইউনিট বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বেশি দরকার প্রচারণা এবং প্রচারণা। এখন এসব নিয়েই সরকারের মাথা ঘামানো উচিত।
আমরা আর শিশু মৃত্যু দেখতে চাইনা, চাইনা আমাদের মন্দ রাজনীতির কারণে বাবা-মায়ের বুক খালি হোক।
'যে ফুল না ফুটিতে
ঝরেছে ধরণীতে,
যে নদী মরুপথে
হারাল ধারা,
জানি হে জানি তাও
হয় নি হারা।'
কবির মতোই প্রার্থনা করি সেই শিশুরা আবার বাবা-মায়ের কোলে ফিরে আসুক। আমরা আর তাদের হারাতে দেব না।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
