শিশুদের জীবন বাঁচাতে জরুরিভিত্তিতে টিকা আনানোর ব্যবস্থা করুন
হঠাৎ করে হামে আক্রান্ত হয়ে আমাদের শিশুরা মারা যাচ্ছে। বহুবছর ধরে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। তাহলে কোন ডাইনির মন্ত্রবলে আবার ফিরে এলো হাম?
হামের বিস্তারকে এখনই রোধ করা না গেলে খুবই মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অথচ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে একটি সফল কর্মসূচি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
কীভাবে দেশে এখনই হামের বিস্তার রোধ করা যাবে, এব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন—যেসব এলাকায় হাম বেশি ছড়িয়েছে, সেসব এলাকায় গণটিকাকরণের ও সর্বস্তরে ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করতে হবে খুব দ্রুত।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে, গণটিকাকরণের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নেই সরকারের কাছে। তাহলে কি হামের বিস্তার ঘটতেই থাকবে? এরকম একটি সংকটে পড়ে বিশেষজ্ঞরা চাইছেন যেমন করেই হোক শিশুদের জন্য দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করতে, অনেকটা ক্রাশ প্রোগ্রামের মতো। আমলাতন্ত্রের সমস্যা কাটিয়ে মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত টাকা ছাড়ের ব্যবস্থা করে, তাহলে হয়তো অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে তারা মনে করেন।
অথচ টিকা আনা এবং টিকা দেয়ার এই কাজটা করা খুব কঠিন কিছু ছিল না। এটা ছিল রুটিন ওয়ার্ক বা চলমান প্রক্রিয়া। যেমন—ভ্যাকসিন আনা, বিভিন্ন সেন্টারে সেই ভ্যাকসিন পাঠিয়ে দেয়া এবং শিশুদের সেই টিকার আওতায় আনা।
এত সহজ ও সিস্টেম্যাটিক কাজটা অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সময়কালে করলো না কেন? এই প্রত্যক্ষ কারণে আজকে আমাদের বাচ্চারা মারা যাচ্ছে হামে আক্রান্ত হয়ে। এখন বারবার যে প্রশ্নটা উঠেছে, তা হলো কেন টিকা নাই হয়ে গেল?
বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়। তবে টিকা কর্মসূচির কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) এর সূত্র মতে কেন্দ্রীয় গুদামে হাম-রুবেলার টিকার মজুত শূন্য। কোন জেলা বা কোন উপজেলায় টিকার মজুত ফুরিয়ে গেছে, তা জানা নেই। সরকারি একাধিক কর্মকর্তা ও একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন সব শিশু ঠিক সময়ে টিকা পাচ্ছে না। কিছু জায়গায় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী নেই। কিছু ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহ নেই। (প্রথম আলো)
হাম আক্রান্ত হয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসেই মারা গেছে ৩২ শিশু। তবে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যোগ করলে এখন পর্যন্ত মোট শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অসংখ্য শিশু হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। আরো অনেক শিশু প্রতিদিন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
যেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর কথা আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম, সেখানে হামে এত শিশুর মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। এ জন্য দায়ী তারাই, যারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টিকে উপেক্ষা করেছেন। কেন টিকা শেষ হয়ে গেল, কেন এই খবর কেউ জানতে পারলো না? কেন শিশুরা মারা যাচ্ছে এর তদন্ত ও শাস্তি হওয়া দরকার। এই বিপর্যয়কে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, আগে টিকা কেনা হতো স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসপি) থাকা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে। ওপির লাইন ডিরেক্টর ইউনিসেফ ও গ্যাভির সহায়তায় তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ে টিকা কিনতে পারতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের আগস্টে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এরপর থেকে নতুন প্রকল্প-দলিল তৈরি, প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড় সবকিছুতে বিলম্ব হচ্ছে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, টিকা কেনার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) বড় ভূমিকা থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন ডিজির পদ খালি ছিল। বিএনপি সরকার গঠনের পর নতুন ডিজির পদে বসেছেন অধ্যাপক প্রভাত কুমার বিশ্বাস। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই হামের টিকা সংকটের পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। (প্রথম আলো)
বাংলাদেশ টিকা কর্মসূচিতে সফল দেশ হিসেবে সেই ৯০ এর দশক থেকে বিবেচিত হয়ে আসছে। নিয়মিত টিকাদান এবং বিভিন্ন ধরনের টিকা কর্মসূচির কারণে বাংলাদেশ পোলিও এবং ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ছিল।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে টিকার সংকট চলছে। কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগের টিকার মজুত শূন্যে নেমেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, টিকা কেনার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা ও জনবল ঘাটতির কারণে শিশু ও মায়েরা ঠিকমতো টিকা পাচ্ছেন না। ঘুরেফিরে সেই একই প্রশ্ন গাফিলতিটা কার? কারা এই বড় সংকটকে পাত্তা দেয়নি?
এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বৃদ্ধি পেতে থাকে।
আমরা জানি, হাম খুবই সংক্রামক অসুখ এবং খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। শিশুদের একজন হামে আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫/১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, শিশুর মৃত্যুর হার বাড়তে পারে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯টি টিকা দেওয়া হয়। বিভিন্ন বয়সী শিশুদের দেওয়া হয় সাতটি টিকা। বিসিজি টিকা দেওয়া হয় যক্ষ্মা প্রতিরোধে; পেন্টা টিকা দেওয়া হয় ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি ও হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধে; ওপিভি টিকা দেওয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে; আইপিভি দেওয়া হয় পোলিও প্রতিরোধে; নিউমোনিয়া প্রতিরোধে দেওয়া হয় পিসিভি টিকা; হাম ও রুবেলা রোগ প্রতিরোধে এমআর টিকা এবং টিসিভি টিকা দেওয়া হয় টাইফয়েড প্রতিরোধে।
ইপিআই এর তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি এই ছয়টি টিকার মজুত শূন্য। আইপিভি ও টিসিভি চলবে জুন পর্যন্ত এবং এইচপিভির মজুত আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, শুধু যে টিকার ভান্ডার শূন্য, তা নয়, আরও সমস্যা আছে।
একদিকে টিকার সংকট, অন্যদিকে রয়েছে জনবল সংকট। ৩৭ জেলায় মাঠপর্যায়ে ৪৫ শতাংশ কর্মী নেই। এছাড়া বেতন-ভাতা নিয়ে কর্মীদের মধ্যে আছে অসন্তোষ। ২০২৫ সালে এক বছরেই সারা দেশের স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যান। এ সময়ে সারা দেশে টিকা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এই সংকট ও সমন্বয়হীনতার দায় বহন করতে হচ্ছে শিশুদের, শিশুরা মারা যাচ্ছে।
ইপিআই এর এই টিকাদান কর্মসূচি দেশে উৎসবের মতো পালিত হতো। গ্রামেগঞ্জে, শহরের পাড়া-মহল্লায় মানুুষ ছুটে যেতেন বাচ্চাদের নিয়ে। কোনো নেতিবাচক প্রচারণাতেই কাজ হয়নি টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে।
দুইভাবে টিকা দেওয়া হতো, একটি হচ্ছে নিয়মিত টিকা কর্মসূচি। এটি সারা বছর ধরে চলে। এই টিকা দেওয়া হয় মাঠপর্যায়ে। কোন বয়সে কোন টিকা দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট করা আছে। আর এই নিয়মিত টিকার পাশাপাশি টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়। একটি নির্দিষ্ট বয়সী দেশের সব শিশুকে অল্প কয়েক দিনের মধ্যে টিকার আওতায় আনা হয়। এই ক্যাম্পেইনের আগে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয়। এর পাশাপাশি জাতীয়ভাবে ভিটামিন এ-এর ক্যাম্পেইনও করা হয়।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম হতে দেখা যাচ্ছে। অথচ টিকা দেওয়া হচ্ছে ৯ মাস ও ৯ মাসের পর থেকে।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা আগেই বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। এর বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজা দরকার। বিষয়টি দেড় বছর আগে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।"
অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রণালয় চুপ করে ছিল, কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। টিকা সংগ্রহ থেকে শুরু করে টিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কাজটি এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম কেন হচ্ছে তা খুঁজে বের করা খুব জরুরি এবং এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ। কেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজটি করেনি, এই উত্তর কি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বা প্রধান উপদেষ্টা দেবেন?
তারা তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে দেশের জন্য অনেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাহলে ইপিআই এর টিকা সংকট নিয়ে কোনো ইতিবাচক ব্যবস্থা নেননি কেন? এই কাজটা করা খুব কঠিন কিছু ছিল না।
আশঙ্কা হচ্ছে টিকা দান নিয়মিত না করা গেলে শিশুরা ভবিষ্যতে আরো অনেক রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যে রোগগুলো বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। আপনাদের গাফিলতির কারণে এখন শিশুদের জীবন হুমকির মুখে।
বর্তমান সরকারের কাছে নিবেদন এই অবস্থায় দ্রুত টিকাদান নিশ্চিত করুন। পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনুন। আমাদের শিশুদের বাঁচান।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
