কমছে না হামের প্রকোপ, টিকার প্রকৃত আওতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে না। এতে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত আওতা (কাভারেজ) ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এখনো প্রতিদিন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে গড়ে ১ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে চার থেকে ছয়জন। গত ছয় মাসে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুহীন একটি দিনও কাটেনি।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৭ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুলের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। এসব শিশুকে দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনার পাশাপাশি টিকা নেওয়া শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে হামের প্রকোপ কমবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হুসাইন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সরকার মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে যারা এখনো টিকা পায়নি, তাদের চিহ্নিত করে টিকাদানের আওতায় আনছে। বাকি শিশুদের টিকাদান শেষ করে কভারেজ ৯৫ শতাংশে নেওয়া সম্ভব হলে হাম সংক্রমণ কমবে। তবে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির জন্য আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।"
তিনি বলেন, শুধু টিকাদান দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। একই সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তৃণমূল পর্যায় থেকেই রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে গুরুতর রোগীর চাপ হাসপাতালগুলোতে বাড়তে থাকবে।
চলতি বছরের মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর ৫ এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে লক্ষ্য করে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ অর্জনের কথা বলা হয়েছে।
তবে গত জুনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। দুই কর্মসূচির লক্ষ্যসংখ্যার তুলনা করলে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভ্যাকসিনোলজিস্ট ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "হামের টিকার শতভাগ কভারেজ হয়েছে বলা হলেও প্রকৃত কভারেজ হয়েছে ৮১ শতাংশ। ৯৫ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় না আসায় সংক্রমণ কমছে না। সংক্রমণ না কমায় মৃত্যুও কমছে না।"
তিনি বলেন, "পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম দেখা যাচ্ছে। তাই ১০ বা ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করে ক্যাম্পেইন করা প্রয়োজন। অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা উচিত।"
এ ছাড়া আইইডিসিআরের পরীক্ষায় টিকা নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ফলাফলের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন টিবিএসকে বলেন, ভিটামিন 'এ' ক্যাম্পেইনের পর সরকার বুঝতে পারে, হামের টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল ছিল। ২০ মে জাতীয় হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন শেষ হলেও পরদিন থেকেই স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দিচ্ছেন।
টিকা কাজ করছে কি না, দেখবে আইইডিসিআর
হামের টিকা নেওয়া শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। চলতি মাসেই এ পরীক্ষা শুরু করার কথা রয়েছে আইইডিসিআরের।
আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী টিবিএসকে বলেন, "হামের ভ্যাকসিন নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে সুরক্ষামূলক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে নমুনা সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।"
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার কিট বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে। আগামী ১০ তারিখের দিকে কিট হাতে পাওয়ার পর পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হবে।
ডা. জাকী বলেন, "টিকাদানের পর শিশুদের শরীরে নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা পরিমাপ করাই এ পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য। এটি একটি সংবেদনশীল ও ব্যয়বহুল কোয়ান্টিটেটিভ পরীক্ষা। দেশে এ পরীক্ষার সক্ষমতা না থাকায় বিদেশ থেকে পরীক্ষার কিট আনা হচ্ছে।"
প্রাথমিকভাবে শহরাঞ্চলের একটি ক্লাস্টার নিয়ে কাজ শুরু করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এরপর পর্যায়ক্রমে গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন ক্লাস্টার থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
নমুনার সংখ্যা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ন্যূনতম ৫০০ থেকে ৬০০ শিশুর নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। নমুনা পরীক্ষা শেষে ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এখনও চাপে হাসপাতালগুলো
হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. আসিফ আহমেদ হাওলাদার টিবিএসকে বলেন, হাসপাতালে হাম রোগীর চাপ সামান্য কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন হাম রোগী ভর্তি থাকছেন। শনিবার সকালে ৩৪৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।
প্রতিদিন নতুন করে ৮০ থেকে ১০০ জনের মতো হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আগে দৈনিক নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা ১২০ থেকে ১৩০ পর্যন্ত উঠেছিল। সেখান থেকে বর্তমানে কিছুটা কমেছে।
ডা. আসিফ বলেন, হাম আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এখনো আইসিইউতে রোগী ভর্তি থাকছেন। সেখানে সাধারণত ৪৮ থেকে ৫২ জন রোগী থাকছেন।
হাম রোগীর অব্যাহত চাপ চিকিৎসাব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। গতকাল সিলেটে হাম আক্রান্ত আট মাস বয়সী এক শিশু আইসিইউ শয্যা না পেয়ে মারা গেছে।
ডা. মুশতাক হুসাইন বলেন, সংকটাপন্ন রোগীদের আইসিইউ প্রয়োজন হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে সারা দেশে হাম সন্দেহে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৪৪ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০০ জন সুস্থ হয়েছেন।
