আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং বয়কটের যত ঘটনা
ক্রিকেট বিশ্বকাপের শুরুটা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে, ইংল্যান্ডে। তখন এক দিনের ক্রিকেট ছিল নতুন উত্তেজনার নাম, আর সেই উত্তেজনাকে বিশ্বমঞ্চে এনে দিয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ। ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেবার শিরোপা জিতেছিল। সেখান থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শুধু ব্যাট–বলের লড়াই নয়, বহু সময় রাজনীতি, নিরাপত্তা আর কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছে। সেই পথ চলায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বয়কটের ঘটনাও কম নয়।
বর্ণবাদ ও দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাসন (১৯৭০-১৯৯১)
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক আগ দিয়েই ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বয়কটের ঘটনাটি ঘটে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী নীতির প্রতিবাদে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তাদের নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত প্রথম চারটি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা অংশ নিতে পারেনি। ১৯৯১ সালে বর্ণবাদ প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তারা আবার ক্রিকেটে ফেরে। এটি ছিল ইতিহাসের দীর্ঘতম বয়কট।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বয়কটের একটি দেখা যায় ১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজন করছিল টুর্নামেন্টটি। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় তখন চলছিল গৃহযুদ্ধ। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে কলম্বোয় ভয়াবহ বোমা হামলা নিরাপত্তা শঙ্কাকে আরও তীব্র করে তোলে। শ্রীলঙ্কার প্রতি সংহতি জানাতে ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ একাদশ কলম্বোয় একটি প্রীতি ম্যাচ খেললেও অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে দুটি দলই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচে ওয়াকওভার দিয়ে পয়েন্ট হারায়। তবু কাকতালীয়ভাবে তিন দলই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে, আর শেষ পর্যন্ত লাহোরের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জেতে শ্রীলঙ্কা। এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দেয়, মাঠের বাইরের পরিস্থিতি কীভাবে সরাসরি ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে
এর সাত বছর পর, ২০০৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে বয়কট আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নেয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়ায় আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ড হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। সে সময় ব্রিটিশ সরকার প্রকাশ্যেই রবার্ট মুগাবে সরকারের বিরোধিতা করছিল এবং তাদের মতে, এমন সরকারের অধীনে খেলতে যাওয়া নৈতিকভাবে ঠিক নয়। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলে নাইরোবিতে কেনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে যায়নি; এর কয়েক মাস আগেই মোম্বাসায় বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। দুই দলই ম্যাচ ভেন্যু বদলের অনুরোধ করলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল তা মানেনি। ফলাফল হিসেবে জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া ওয়াকওভার পায়। ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়, আর কেনিয়া এই দুই পয়েন্টের সুবাদে সুপার সিক্সে উঠে শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে যায়—বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রূপকথা।
বয়কটের ইতিহাস শুধু মাঠে না নামার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কখনো পুরো টুর্নামেন্ট থেকেও সরে দাঁড়ানোর নজির আছে। ২০০৯ সালের টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ে ঠিক সেটাই করেছিল। ইংল্যান্ডে আয়োজিত ওই টুর্নামেন্টের আগে মুগাবে সরকারের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সম্পর্ক চরম তিক্ততায় পৌঁছায়। জিম্বাবুয়ের খেলোয়াড়দের ভিসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, এমনকি ভিসা না পেলে বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার কথাও আলোচনায় আসে। শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালের জুলাইয়ে জিম্বাবুয়ে 'খেলার বৃহত্তর স্বার্থে' বিশ্বকাপ থেকের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পূর্ণ অংশগ্রহণ ফি পায়, আর বাছাইপর্ব থেকে উঠে এসে স্কটল্যান্ড মূল পর্বে খেলার সুযোগ পায়।
নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে বয়কটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ২০১৬ সালের অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ ছিল আয়োজক দেশ। এর এক বছর আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বলে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল, আর সেই অবস্থান তারা ধরে রাখে যুব বিশ্বকাপেও। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানালেও হতাশা প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার জায়গায় খেলেছিল আয়ারল্যান্ড। (সূত্র: আইসিসি, অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড বিবৃতি।)
সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। ২৯ বছর পর পাকিস্তানে কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল টুর্নামেন্ট আয়োজন হলেও শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল—ভারত যাবে কি না। ২০২৩ বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারতে খেললেও দুই বছর পর ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড জানায়, সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় তারা পাকিস্তানে যেতে পারছে না। দীর্ঘ আলোচনা শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সঙ্গে সমঝোতায় ২০২৪ থেকে ২০২৭ চক্রে সিদ্ধান্ত হয়, ভারত ও পাকিস্তান একে অন্যের দেশে আয়োজিত টুর্নামেন্টে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলবে। সেই অনুযায়ী ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের ম্যাচগুলো হয় দুবাইয়ে, আর শেষ পর্যন্ত ভারতই শিরোপা জিতে নেয়।
এই সব ঘটনা একসাথে দেখলে বোঝা যায়, ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাস শুধু খেলাধুলার নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা বাস্তবতা আর কূটনৈতিক সমঝোতারও এক জীবন্ত দলিল। মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত যে কখনো কখনো মাঠের ফলাফল বদলে দিতে পারে, বিশ্বকাপের বয়কটের এই ইতিহাস তারই প্রমাণ।
