পাখি কি কেবলই সংরক্ষণের বিষয়, নাকি প্রয়োজন আমাদের সহমর্মিতা?
সাল ২০১৮, মারজাত বাঁওড়, এক শীতের সকাল। আমার নৌকাটি জলাভূমির বুক চিরে এগিয়ে চলছে। চারপাশের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল কোনো স্বপ্নরাজ্যে আছি, ঘোর কাটানোর জন্য নিজের গায়ে চিমটি কাটলাম। না, এটা বাস্তব। দেখলাম ৬২টি জলময়ূর একসঙ্গে ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল। পাশের কাদার মধ্যে চড়ে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কাদাখোঁচা পাখি। আছে পরিযায়ী বুনোহাঁস, বক, ডুবুরি, কাস্তেচরা, কোড়া, কালেম ও পানকৌড়িসহ বিচিত্র সব পাখি।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেই পাখিদের অর্ধেকের দেখাও আমি ২০২৫ সালে এসে পাইনি। অথচ এখানে ব্যাপকভাবে পাখি শিকার হয়নি কিংবা আবাসস্থলও ধ্বংস হয়নি। তবে ঘটে গেছে অন্য কিছু; যার ফলে আমাদের পাখিরা আজ বিপন্ন। আর এই সংকটের সম্মুখীন সবচেয়ে বেশি হয়েছে জলাভূমি-কেন্দ্রিক পাখিরা।
যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেন বা বসবাস করেন, তারা জানেন আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে গ্রামীণ বা শহুরে জলাভূমিগুলো কতটা সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে এই জলাভূমি ও এর বন্যপ্রাণীরা। আমাদের বিল, বাঁওড় আর প্লাবনভূমিগুলো এখন কোথায়? এগুলো এখন ছোট, বয়স্ক, জীর্ণশীর্ণ জীবনের পড়ন্ত বিকেলে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকা একেকটি জলাশয়। চারপাশ কচুরিপানায় ঘেরা, যা পচে গিয়ে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিছু সাদা বক, কয়েকটি ছোট পানকৌড়ি, দু-চারটি মাছরাঙা, শালিক, ময়না আর ভুবনচিল। এই হলো আমাদের বর্তমানের 'পাখি'। এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দখল ও দূষণের ভয়াবহ চিত্র।
জলাশয়-সংলগ্ন জনপদের প্রবীণদের মতে, জলাশয়-কেন্দ্রিক পাখিরা আরও অনেক আগেই এখান থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিদায় নিয়েছে। বর্তমানে ফসলের বাগান বা সবজি খেত বাঁচাতে চারপাশে যে জাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে আটকে প্রাণ হারাচ্ছে কাঠঠোকরা, বক, ফিঙে, মুনিয়া, রাতচরা ও দোয়েলসহ অনেক পাখি। জালের ফাঁসে মরে পড়ে থাকছে নিমপেঁচা, হাঁড়িচাচা ও ঘুঘুর মতো পাখি। অথচ এদের কেউই ফলভুক নয়।
বাংলার সবুজ গ্রামের জলাশয়ে পাখির যে কোলাহল একসময় জীবনের ছন্দ তৈরি করত, আজ তা কি আগের মতো আছে? পাখি শিকার, পাচার, নগরায়ণ, বন উজাড় কিংবা শিল্পায়ন; এগুলো তো দৃশ্যমান হুমকি। কিন্তু এর আড়ালে রয়েছে কিছু 'নীরব ঘাতক', যা নিঃশব্দে আমাদের পাখিবৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। এই নীরব মৃত্যু বোঝা যায় কোনো নির্দিষ্ট এলাকার পাখির প্রজাতি বিন্যাস ও পরিবেশের ভারসাম্য, ও প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন এবং তাদের তুলনামূলক অবস্থান পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। যখন কোনো আবাসস্থলে জলচর পাখি, বৃক্ষবাসী পাখি বা কৃষিজমির পোকাখেকো পাখির স্বাভাবিক অনুপাতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়, তখনই বিপদের সংকেত মেলে।
আজ আমরা দেখছি, আবাসস্থল-নির্ভর বিশেষায়িত পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ বা সব পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারা পাখির সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থাপনার সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর রূপান্তর। বিশেষ করে জলাশয়-কেন্দ্রিক পাখিরা এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিল, হাওর বা বাঁওড়; যেখানে একসময় পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় ছিল; সেখানকার অবস্থা এখন নাজুক। শিকার চোখে পড়লেও জলাশয়ের অজৈব নিয়ামকের পরিবর্তন পুরো বাস্তুতন্ত্রকে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রতিটি প্রাণীর খাদ্যাভ্যাস ও আবাসস্থল স্বতন্ত্র। একই পরিবেশে বিভিন্ন স্তরে খাদ্য সরবরাহ থাকায় নানা প্রজাতির সহাবস্থান সম্ভব হয়। কিন্তু আবাসস্থল-নির্ভর পাখিরা খাদ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। জলাশয়ে যখন দূষণ বাড়ে, কচুরিপানার আধিক্য ঘটে, কীটনাশক ও সার পানিতে মেশে কিংবা জলবায়ুর প্রভাবে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে, তখন সেই খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। ফলস্বরূপ পাখিরা হারায় তাদের খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়।
সারা দেশের জলাভূমি ঘুরে দেখলে এই বাস্তবতা চোখে পড়ে; জলাশয় আছে, কিন্তু পাখি নেই। এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছ চাষ। অর্থনীতির জন্য মাছ চাষ প্রয়োজনীয় হলেও সমস্যা হলো, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মাছ চাষ পদ্ধতির সঙ্গে পাখি বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কোনো সহাবস্থান নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, শীতকালে যখন পরিযায়ী পাখি আসে, ঠিক তখনই মাছ আহরণের চাপ বাড়ে, ফলে বিঘ্নিত হয় পাখিদের বিচরণ। এছাড়া 'চায়না দুয়ারি'র মতো প্রাণঘাতী জাল পাখিসহ অসংখ্য জলজ প্রাণীর জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানুষের অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ও বিনোদনের চাহিদাও জলাশয়গুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনায় পাখিদের নির্জন আশ্রয়গুলো ক্রমেই পাখিশূন্য হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে কৃষিকাজের বিস্তারে বিলগুলোর জলজ পরিবেশের গুণগত মান কমছে; কীটনাশক ও রাসায়নিক সার পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে, আর পাখিরা বাধ্য হচ্ছে সেই পরিবেশ ছেড়ে চলে যেতে। ফলের বাগানে ব্যবহৃত জাল আজ নিশাচর ও বাগানকেন্দ্রিক পাখিদের যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একসময় গ্রামের সবুজ বাগান, দেশি গাছ ও ঝোপঝাড়ই ছিল পাখিদের সবচেয়ে বড় ভরসা। সবুজ বাগান, দেশি গাছ, গুল্ম আর খোলাপ্রান্তর মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল নিরাপদ আবাসস্থল। আজ গ্রামে সবুজ থাকলেও সেই সবুজে 'প্রাণ' কতটা আছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। জনসংখ্যার চাপে বুনো ফুলে ভরা গুল্ম-লতা হারিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ওপর নির্ভরশীল পাখিরাও।
শহুরে এলাকায় আবাসস্থল হারিয়ে জীববৈচিত্র্য কতটা সংকটে, তা আমাদের সবার জানা। পার্কের নামমাত্র যে এক চিলতে সবুজ ছিল, তা-ও বিনোদনের দোহাই দিয়ে 'সৌন্দর্য বর্ধন'-এর নামে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। দেশি লতাগুল্ম উপড়ে ফেলে লাগানো হচ্ছে বিদেশি শোভাবর্ধক গাছ। ফলে শহরগুলো বুনো পাখিদের কলকাকলি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ঢাকার উদ্যানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, পাঁচ বছর আগেও সেখানে যে পরিমাণ বুনো পাখির আনাগোনা ছিল, এখন তার ছিটেফোঁটাও নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে পার্কগুলো এখন জীর্ণ দশা।
এই বাস্তবতায় 'পাখি সংরক্ষণ' মানে কেবল আইন প্রয়োগ বা শিকার বন্ধ করা নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো পাখিদের প্রতি সদয় ও সহমর্মী হওয়া এবং ভালোবেসে পাখিদের বাঁচতে দেওয়া। জলাশয়কে কেবল সম্পদের ভাণ্ডার নয়, বরং জীবনের আশ্রয় হিসেবে দেখা জরুরি। মাছ চাষ, কৃষিকাজ ও বিনোদনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও পাখির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি একটু সহনশীল হই, পাখিদের জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দিই, তবে বাংলার জলাভূমি আবারও ডানা ঝাপটানোর শব্দে মুখর হয়ে উঠবে। পাখিদের রক্ষা করা মানেই প্রকৃতিকে রক্ষা করা, আর প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভালোবাসা।
শুধুমাত্র সরকারি আইন দিয়ে কোনো দিনই পাখি সংরক্ষণ পূর্ণতা পায় না। আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষের মননে সহানুভূতি ও নৈতিক চেতনা জাগ্রত থাকে। পাখি সংরক্ষণ মূলত একটি সামাজিক দায়িত্ব। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি যদি মানুষের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন না আসে, তবে এই প্রচেষ্টা টেকসই হবে না। পাখি শিকার ও পাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। আইন থাকলেও সামাজিকভাবে এসব কাজকে নিন্দনীয় হিসেবে না দেখলে বন্ধ করা যায় না। পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতাই পারে একে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে।
পাখি সংরক্ষণের ভিত্তি গড়ে ওঠে শৈশবেই। শিশুদের মনে যদি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করা যায়, তবে তারা ভবিষ্যতে প্রকৃতির শত্রু হবে না। পাঠ্যক্রম ও পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের শেখাতে হবে যে, পাখি কেবল শোভাবর্ধক নয়, বরং পরিবেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আহত পাখির প্রতি সদয় হওয়া এবং আবাসস্থল রক্ষা করার মতো মূল্যবোধ তাদের মধ্যে রোপণ করতে হবে।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, নাগরিক ও নেতৃত্বের জায়গায় যাবে। তারা যদি প্রকৃতিবান্ধব চিন্তা ও মূল্যবোধ নিয়ে বড় হয়, তবেই ভবিষ্যৎ সমাজ আরও সহনশীল, মানবিক ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে। তাই পাখি সংরক্ষণ কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি একটি সামাজিক বিনিয়োগ, যা আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য ও সুস্থ পৃথিবী গড়ে তোলার পথপ্রদর্শক।
- আশিকুর রহমান সমী: বন্যপ্রাণী বিষয়ক গবেষক, পরিবেশবিদ ও লেখক; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব
