অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
ঘুমাতে যাওয়ার আগে খবরে দেখলাম চট্রগামের রাঙ্গুনিয়ায় একটি বিল থেকে শাহেদ নামের এক স্কুলছাত্রের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সন্ধ্যায় দেখলাম যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তিনি একজন বরফকল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সাংবাদিক। মাত্র দু'দিন আগে মানিকগঞ্জের ঘিওরে ৬২ বছরের এক নারীকে গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত নারী একজন ক্যান্সার রোগী।
ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, এতগুলো গলা কেটে হত্যার ঘটনা শুধু দুই–একদিনের মধ্যেই ঘটেছে। এই নিহত মানুষগুলোর মধ্যে যে আপনি, আমি, আমাদের সন্তান বা পরিবারের কেউ থাকবে না, এর নিশ্চয়তা কী? এগুলো ঘটনা মনকে দুর্বল, চিন্তিত ও বিষণ্ন করে। অনেকেই পরামর্শ দেন, এইসব খবর এড়িয়ে যেতে। নেগেটিভ চিন্তা না করে, নেগেটিভ খবর না পড়ে পজিটিভ কিছু দেখা দরকার। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ হবে? এরকম অন্ধত্ব নিয়ে তো আমরা অনেকেই বেঁচে আছি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি, কিন্তু হত্যাযজ্ঞ কি বন্ধ হয়েছে?
বাংলাদেশে গলা কেটে হত্যা বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট বলছে। তবে এই পরিস্থিতি হঠাৎ করে হয়নি, এটা সামগ্রিক অপরাধ প্রবণতার অংশ।
২০২৫ সালে হত্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ এর জানুয়ারিতেই ২৯৪টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ছয় মাসে ১,৯৩০টি হত্যা। এর অর্থ গড়ে প্রতিদিন ১১টি হত্যার ঘটনা ঘটছে—যা গত দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক শত্রুতা, নারী বিদ্বেষ, পারিবারিক কলহ, প্রেম, ডাকাতি বা লুটপাটের জেরে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহারের সহজলভ্যতা বা যেকোনো কারণেই হোক নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাড়ছে।
আমি ভাবছি, সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপদজনক ব্যাপারটি হলো এইসব নারকীয় হত্যাকাণ্ড এখন আমাদের কাছে শুধু সংখ্যামাত্র। এতে কারো কিছু যায় আসে না, কোনো কিছু থেমেও থাকে না। খবর দেখছি, অস্থির হচ্ছি, মন খারাপ হচ্ছে—কিন্তু এগুলো ঠেকানোর কোনো উদ্যোগ দেখছি না। সবই দায় সারা গোছের। যতক্ষণ নিজের ঘাড়ে দায়ের কোপ না পড়ছে, ততক্ষণ আমরা নিজেকে নিরাপদ ভাবছি।
বছরের পর বছর বিভিন্ন মামলায় বিভিন্নজন বা একাধিক জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর এক ফাঁকে অভিযুক্তরা জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসে। বহু বছর ধরে এরকম অসংখ্য মামলা হয়েছে। কোনোটায় অপরাধী ছাড়া পেয়েছে, কোনোটায় জামিনে আছে, অভিযুক্ত ব্যক্তির দায় প্রমাণিতই হয়নি কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আবার কোথাও বাদী ভয়ে বা মামলা তুলে নিয়েছেন, কখনোবা মামলাই হয়নি।
প্রায় প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে কাজ করে রাজনীতি, লোভ, হিংসা, হানাহানি। অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রেও বড় হয়ে উঠে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অর্থ ও দায়সারা ভাব। ন্যায়বিচার পাওয়াটা হয় সুদূর পরাহত। আর যেহেতু শাস্তি পাওয়ার ভয় কমে গেছে, তাই অপরাধীরাও দুর্বিনীত হয়ে উঠেছে বা উঠছে। তারা তাদের অপরাধের ক্ষেত্রে নৃশংসতাকে বেশি প্রশ্রয় দিচ্ছে।
মনোবিজ্ঞান এবং ফরেনসিক সাইকোলজি বলে, গলা কেটে বা পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। একটি জটিল প্রক্রিয়া, যা সাধারণত মানুষ করতে চায় না বা করতে ভয় পায়। এই ধরনের অপরাধ যারা করে, তারা গভীর মানসিক অস্থিরতা, উত্তেজনা বা ব্যক্তিত্বের অসুস্থতায় ভুগছে। এই হত্যায় শুধু মেরে ফেলাই লক্ষ নয়, বরং অতিরিক্ত আঘাত বা ওভারকিলিং এবং মিউটিলেশন বা শরীর বিকৃত করার দিকটি গুরুত্ব পায়। এর মাধ্যমে হত্যাকারীর মানসিক অবস্থা বোঝা যায়।
ফরেনসিক সাইকোলজি গবেষণায় বলা হয়েছে হত্যাকারী ভিকটিমকে 'ডিহিউম্যানাইজ' করে বা মানুষ হিসেবে দেখে না। শুধু শত্রু হিসেবেই দেখে। ফলে অতিরিক্ত আঘাত করে। প্রথম আঘাত হিসেবে 'গলা কাটে', তারপর মাল্টিপল কাট বা কোপাতে থাকে। একজনের মৃত্যুর জন্য যতটা দরকার, তার চেয়েও অনেক বেশি আঘাত করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুলি করার পরেও জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করতে চায়। যেমনটা করা হয়েছে বরফ কল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে।
যারা সাইকোপ্যাথ, তাদের মধ্যে স্যাডিজম খুব বেশি কাজ করে। সাইকোপ্যাথ মানুষের মধ্যে সহানুভূতির অভাব, আবেগহীনতা এবং অন্যকে নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছাও থাকে। এর সাথে যখন স্যাডিজম যোগ হয়, তখন ভিকটিমের কষ্ট থেকে এরা আনন্দ পায়।
বাংলাদেশে গত দুই বছরে (২০২৪ এবং ২০২৫) গলা কেটে বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কোনো সরকারি বা মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়নি। খবরে এ ধরনের ঘটনা প্রায়শই চোখে পড়ছে। গলা কেটে হত্যার শিকার হন নারী ও শিশুও। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সাধারণত বয়স ও লিঙ্গভেদে হয় না। সাধারণ ডোমেস্টিক বা পারিবারিক হত্যায় নারী (স্ত্রী, মা, গৃহবধূ) গলা কেটে হত্যার শিকার হন।
২০২৫ সালে মানিকগঞ্জে মা, করুণা রানী ভদ্র, পটুয়াখালীতে গৃহবধূ মুকুল বেগম, খুলনায় শিউলী বেগম, খাগড়াছড়িতে মা-মেয়ে আমেনা বেগম ও রাহেনা আক্তারকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া, তারাগঞ্জে বৃদ্ধ দম্পতি জোগেশ চন্দ্র রায় ও তার স্ত্রীও একইভাবে হত্যার শিকার হন। এগুলো প্রায়শই স্বামী, ছেলে বা পরিচিতদের দ্বারা ঘটে। এর আগে সিলেটে খাদিজাকে একইভাবে কুপিয়েছিল বদরুল নামে একজন। এরও আগে মধুখালিতে চম্পা রানী বণিক দুবৃর্ত্তদের হাতে মারা গিয়েছিলেন এক কিশোরীকে বাঁচাতে গিয়ে।
নৃশংসতা, যা রাগ, আগ্রাসন বা সহিংস প্রবণতা থেকে সৃষ্টি হয়, তা মানুষের স্বাভাবিক আবেগের অংশ, কিন্তু এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ক্ষতি সবার। গলা কেটে খুনের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংখ্যায় এখনো কম হলেও খুবই ভয়ানক এবং সমাজের জন্য গুরুতর সমস্যা। সাম্প্রতিক সময়ে এধরণের ঘটনা ঘটছে বলেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এগুলো বন্ধ করা একা ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সমাজ, পুলিশ, সরকার এবং কমিউনিটির যৌথ প্রচেষ্টা দরকার।
বিভিন্ন কারণে কমিউনিটি লেভেলে প্রতিরোধ করার প্রবণতা কমে গেছে। এ ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেও কেউ চট করে এগিয়ে আসে না। শহরগুলোতে বিশেষ করে মার্কেটে পুলিশের প্যাট্রোলিং বাড়ানো এবং দ্রুত রেসপন্স টিম থাকা দরকার।
যদিও এ ধরনের অপরাধ প্রায়শই সংগঠিত হয়। রাজনৈতিক/আর্থিক/সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তাই একে ঠেকাতে শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়। সরকার এবং পুলিশের উচিত কমিউনিটি গ্রুপ গঠন করা এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।
শিক্ষাঙ্গনে এমন ক্লাস চালু করা দরকার যেন শিশু-কিশোররা ছোটবেলা থেকেই রাগ সংবরণ করতে শেখে, এবং অন্তরে শান্তি আনতে শেখে। পরিবারগুলোতে শিশু-কিশোরদের সহনশীলতা শেখাতে হবে। পশুপাখির প্রতি ভালবাসা বাড়াতে হবে।
মাদকের ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে ভায়োলেন্স ও বেকার সমস্যার সমাধানসহ অর্থনৈতিক আস্থা তৈরি করতে হবে। নয়তো সমাজে অস্থিরতা ও নৃশংসতা বাড়তেই থাকবে। সর্বোপরি দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দেশে বা সমাজে যখন বিচারহীনতা বেড়ে যায়, তখন সন্ত্রাসীর দায়ের কোপ থেকে আমি, আপনি, আমাদের সন্তান ও পরিবার-পরিজন কেউ নিরাপদ নই।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
