বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দিকে এগোচ্ছে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী
ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হটিয়ে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর ওপর পুনরায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। আজ সোমবার গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালী সংলগ্ন বেশকিছু কৌশলগত অবস্থান নিজেদের দখলে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে দেশটির সামরিক ও সরকারি সূত্র।
রয়টার্সকে ইয়েমেনের তিনটি সামরিক ও একটি সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালীর নিকটবর্তী দুবাব অঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সরকারি বাহিনী। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিমান হামলার জোরালো সহায়তায় এলাকাটিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
তবে হুথি সমর্থিত গণমাধ্যম সরকারি বাহিনীর এই অগ্রগতির দাবিকে "সম্পূর্ণ মিথ্যা" বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে, গতকাল রোববার শেষ রাতের দিকে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ নগরীর দিকে যাওয়া পাহাড়ি রাস্তার বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এতে সেখানে অবস্থানরত সরকারি বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে সৌদি-সমর্থিত সরকারের পাঁচটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে অন্য একটি সরকারি সূত্র রাস্তা বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
হুমকির মুখে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যের পথ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের জেরে কয়েক বছর নিষ্ক্রিয় থাকা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আবার নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইয়েমেনের কয়েকটি ফ্রন্টে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং একই সাথে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এমনিতেই উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার ওপর ইয়েমেনের এই লড়াই লোহিত সাগরের আরেকটি প্রধান তেল পরিবহন পথকে হুমকির মুখে ফেলেছে—যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এর আগে রোববার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেয়। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, "সন্ত্রাসী মিলিশিয়াদের কবল থেকে দেশকে সম্পূর্ণ মুক্ত না করা পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।"
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া সৌদি আরব– এই সামরিক অভিযানে জোরালো বিমান সহায়তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং নিজেদের ভূখণ্ডে হুথিদের হামলা বন্ধ করতে মিত্রদের কাছে লজিস্টিক সহায়তার আহ্বানও জানিয়েছে রিয়াদ।
সোমবার রিয়াদ জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালী ও ইয়েমেনি স্থল বাহিনীকে আকাশপথে সুরক্ষা দিতে তারা ইয়েমেনের ভেতরে শত শত লক্ষ্যবস্তুতে যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে। দেশটির রাজধানী সানাসহ কয়েকটি ফ্রন্টে এমন হামলা চালানোর কথা ইয়েমেন সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনে সবচেয়ে তীব্র লড়াই
কয়েকটি জায়গায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লেও, দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর উপকূলীয় অঞ্চল এবং তাইজ নগরীর আশপাশের পাহাড়গুলোতে সবচেয়ে তীব্র লড়াই চলছে। সেখানে সরকারি বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে হুথি বিদ্রোহীরা।
গত সপ্তাহে হুথিদের হামলায় তাইজ-এডেন সংযোগ সড়কের একটি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে—সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
ইয়েমেন সরকারের পাঁচটি সামরিক সূত্র জানায়, রোববার রাতে হুথি যোদ্ধারা ওই সড়ক ধরে উঁচু পাহাড়ি এলাকা 'আল-তুরাবাহ' শহরে নতুন করে অগ্রসর হয়। তবে আরেকটি সূত্র এ দাবি অস্বীকার করেছে।
এদিকে সোমবার হুথি নিয়ন্ত্রিত বার্তাসংস্থা এক সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তারা তাইজ প্রদেশের আল-মাওয়াসিত জেলা থেকে সরকারি বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান আলিমির বাসভবন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
সামরিক সূত্রগুলো বলছে, হুথিদের এই নতুন অগ্রগতির ফলে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পাঁচ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার এই শহরে কয়েক হাজার সরকারি সেনা মোতায়েন রয়েছে।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত তাইজ শহর—গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায়ই হুথিদের কামানের গোলা ও স্নাইপার হামলার ঘটনা ঘটে।
২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনের এই সংঘাত শুরু হয়। পরের বছর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করতে এবং ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটিকে হটানোর লক্ষ্যে, সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। কিন্তু, এই যুদ্ধ অচিরেই রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থায় রূপ নেয়—যা বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র আরব দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করে। পরে ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা চলতি বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত বজায় ছিল।
