বন, নদী, জল ও জীবন: বিপন্ন বাংলার ধমনী এবং আমাদের দায়
নদীর কাছে মানুষের ঋণ কোনো দিন শোধ হওয়ার নয়। একজন জেলের কাছে নদী শুধু পানি নয়, তার সংসারের ভাতের হাঁড়ি। একজন কৃষকের কাছে নদী শুধু স্রোত নয়, তার ফসলের প্রাণ। একটি শিশুর কাছে নদী মানে শৈশবের সাঁতার, বর্ষার নৌকাভ্রমণ, জাল ফেলে মাছ ধরার আনন্দ। একটি জনপদের কাছে নদী মানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং অস্তিত্ব।
তাই প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার পালিত বিশ্ব নদী দিবস আমাদের শুধু নদীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না, আমাদের শিকড়ের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, 'No Forest, No Rivers, No Water, No Life' বা 'বন নেই, নদী নেই, পানি নেই, জীবনও নেই' প্রকৃতির আন্তসম্পর্কের এক গভীর সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরে। বন, নদী, পানি ও জীবন একে অপরের পরিপূরক। এর একটি ধ্বংস হলে অন্যটিও টিকে থাকতে পারে না।
নদীর দেশ বাংলাদেশ
বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, কর্ণফুলী, ধরলা, আত্রাই, কপোতাক্ষ, মধুমতী, সুরমা, কুশিয়ারা, ফেনীসহ শত শত নদী এ দেশের ভূপ্রকৃতি, অর্থনীতি এবং সভ্যতাকে গড়ে তুলেছে। পৃথিবীর খুব কম দেশ আছে যেখানে নদী মানুষের জীবনকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। আজকের বাংলাদেশের জন্মও নদীর হাত ধরেই। হিমালয় থেকে বয়ে আসা নদীগুলোর পলি জমে সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ। এই নদীগুলোই হাজার বছর ধরে উর্বর করেছে বাংলার মাটি, গড়ে তুলেছে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনবসতি। বাংলার সাহিত্য, সংগীত, লোকসংস্কৃতি, ভাটিয়ালি, সারিগান, জারি-সারি, পালাগান—সবখানেই নদীর উপস্থিতি স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ থেকে জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন থেকে আবদুল আলীম—বাংলার সৃষ্টিশীলতার এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ নদী।
একটি জেলের জীবন মানেই একটি নদীর গল্প
ভোর হওয়ার আগেই নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন একজন জেলে। তার হাতে থাকে জাল, মনে থাকে আশা। আজ মাছ ভালো পাওয়া যাবে তো? আজ বাড়ি ফিরে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন তো? তার সন্তান স্কুলে যাবে কি না, তার মেয়ের বিয়ের খরচ জোগাড় হবে কি না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা হবে কি না—সবকিছু অনেকাংশে নির্ভর করে নদীর ওপর। নদী যখন সুস্থ থাকে, মাছ থাকে, জীবিকা থাকে, স্বপ্ন থাকে। কিন্তু নদী যখন বিষাক্ত হয়ে যায়, মাছ হারিয়ে যায়, তখন সেই জেলের জীবন থেকেও হারিয়ে যায় নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশের অনেক নদীতীরবর্তী এলাকায় আজ অসংখ্য জেলে পরিবার আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে, নাব্যতা কমছে। ফলে নদীনির্ভর মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ছেন। নদীর ক্ষতি মানে শুধু পরিবেশের ক্ষতি নয়; এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির ক্ষতি।
বন হারালে নদী হারায়
এবারের বিশ্ব নদী দিবসের প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ি বন কেটে ফেলা হলে বৃষ্টির পানি মাটিতে ধরে রাখা যায় না। দ্রুত মাটিক ক্ষয় হয়। পলি এসে নদীতে জমে। নদী ভরাট হয়। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যায়। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল, সিলেট ও দেশের বিভিন্ন এলাকার বন উজাড়ের প্রভাব স্থানীয় নদী ও ছড়াগুলোর ওপর ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। বন হলো নদীর অভিভাবক। বন বৃষ্টি ধরে রাখে, মাটি রক্ষা করে, পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বন রক্ষা ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়। আর নদী রক্ষা ছাড়া নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
নদী আজ নানা সংকটে
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অনেক নদী আজ অস্তিত্বের লড়াই করছে। একদিকে অবৈধ দখল, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পবর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন, বালু উত্তোলন ও নাব্যতা সংকট নদীগুলোকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক নদী মানচিত্রে আছে, বাস্তবে নেই। অনেক নদী বর্ষায় নদী, শুষ্ক মৌসুমে ড্রেনের রূপ ধারণ করে। একসময় ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা ছিল প্রাণচঞ্চল নদী। আজ এসব নদীর অনেক অংশ দূষণ ও দখলের চাপে বিপর্যস্ত। যে নদী একসময় হাজার মানুষের জীবিকা দিত, আজ সেই নদীর পানিতে অনেক স্থানে মাছও টিকে থাকতে পারে না।
নদী রক্ষায় এখনই যা করতে হবে
নদী রক্ষা কেবল পরিবেশ অধিদপ্তর বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব। নদী রক্ষায় কিছু কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
প্রথমত,নদী দখলের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করতে হবে। নদীর সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেন পরিশোধন ছাড়া বর্জ্য নদীতে ফেলতে না পারে, তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং পরিচালনা করতে হবে। চতুর্থত, নদীতীরবর্তী এলাকায় বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পঞ্চমত, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নদী ও জলসম্পদ বিষয়ে পরিবেশশিক্ষা আরও শক্তিশালী করতে হবে। ষষ্ঠত, স্থানীয় জনগণ, জেলে সম্প্রদায়, কৃষক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে নদীভিত্তিক জনআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সপ্তমত, প্রতিটি নদীর জন্য সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনা (Integrated River Basin Management) বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে নদীকে খণ্ডিত নয়, একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে দেখা হয়।
নদীকে ভালোবাসার সময় এখনই
বিশ্ব নদী দিবস আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখে। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে নদী থাকবে শুধু বইয়ের পাতায়? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিশুরা নদীতে নৌকা ভাসাবে, জেলেরা মাছ ধরবে, কৃষকের মাঠ সেচ পাবে, নদীতীরে আবারও প্রাণ ফিরে আসবে? নদীকে বাঁচানো মানে কেবল পানি সংরক্ষণ নয়। নদীকে বাঁচানো মানে মানুষের স্বপ্ন বাঁচানো, জীবিকা বাঁচানো, সংস্কৃতি বাঁচানো, ভবিষ্যৎ বাঁচানো। আজকের শিশুদের জন্য, আগামী প্রজন্মের জন্য এবং আমাদের অস্তিত্বের জন্য নদীগুলোকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ;
পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী; মেইল: shiblu@nstu.edu.bd
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
