তীব্র গরমে শুকিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের নদী, দেখা যাচ্ছে মহাকাশ থেকেও
টানা তাপপ্রবাহ এবং বৃষ্টির অভাবে চরম সংকটে পড়েছে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ কিছু নদী। কিছু কিছু জায়গায় পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নেমে গেছে। এ ভয়াবহতা এতটাই প্রকট যে তা মহাকাশ থেকেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
তীব্র খরার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন নদীর পানি অনেক কমে গেছে। পানি কমে যাওয়ায় নদীর দুই তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং সাধারণত পানির নিচে ডুবে থাকা দীর্ঘ বালুচর এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
২০২৩ সালের স্যাটেলাইট ছবির সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়, তখন নদীগুলোর পানিপ্রবাহ ছিল মোটামুটি স্বাভাবিক। সেই তুলনায় এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা এই মহাদেশে গ্রীষ্মকাল দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। একের পর এক তীব্র তাপপ্রবাহে মাটি ও নদীর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, আর দীর্ঘস্থায়ী খরা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর প্রভাবও ব্যাপক। ইউরোপের নদীগুলো পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতল রাখা, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু নদীগুলোর পানি কমে যাওয়ায় মানুষ, অর্থনীতি ও পরিবেশ সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গ্রীষ্মকালে ইউরোপের নদীগুলোর পানির স্তর কমে যাওয়া নতুন নয়। তবে এ বছর অনেক জায়গায় তা নজিরবিহীন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশেষ করে মহাদেশটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ নদী দানিউব ও রাইন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জার্মানি থেকে উৎপন্ন হয়ে ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে কৃষ্ণসাগরে গিয়ে মিশেছে ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউব। সেই নদীর পানির স্তর হাঙ্গেরিতে রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সোমবার রাজধানী বুদাপেস্টে দাদনিউবের পানির গভীরতা নেমে আসে মাত্র ৪ ইঞ্চিতে। এতে ২০১৮ সালে রেকর্ড হওয়া ১৩ ইঞ্চির সর্বনিম্ন স্তরও ভেঙে গেছে। এ সপ্তাহে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে নতুন তাপপ্রবাহে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে নদীর পানির স্তর আরও কমে যেতে পারে।
দানিউবের পানি কমে যাওয়ায় হাঙ্গেরিতে জ্বালানি সংকটও দেখা দিয়েছে। দেশটির প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র শীতলীকরণের জন্য দানিউবের পানির ওপর নির্ভরশীল। সেটি বর্তমানে মাত্র ১০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। পানির স্তর কমে যাওয়ায় কেন্দ্রটির একটি ছাড়া বাকি সব রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখতে হয়েছে। নদীর পানি আরও কমে গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পেতের ম্যাজিয়ার সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে স্বেচ্ছায় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সাধারণ মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
রোমানিয়াও জ্বালানি সংকটে পড়েছে। সোমবার দেশটির নৌবাহিনী বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর ভেঙে দানিউব নদীর পানি ঘুরিয়ে একমাত্র চালু থাকা চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরে নেওয়ার চেষ্টা চালায়।
রয়টার্স জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে আরও বেশি পানি পৌঁছাতে দানিউবের একটি শাখা নদীতে পাথরভর্তি দুটি বার্জ ডুবিয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংস্থা।
নদীর পানি কমে যাওয়ায় পর্যটন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক নদীভিত্তিক প্রমোদতরী ভ্রমণ বাতিল বা রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। গত সপ্তাহে বুলগেরিয়ায় দানিউব নদীর একটি বালুচরে একটি প্রমোদতরী আটকে যায়।
নদীর পানি কমে যাওয়ায় বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শনও প্রকাশ পাচ্ছে। গত সপ্তাহে উত্তর বুলগেরিয়ায় একটি প্রাচীন ম্যামথের বলে ধারণা করা দেহাবশেষ এবং সার্বিয়ায় ডুবে থাকা নাৎসি যুগের একটি যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।
এদিকে, সুইস আল্পস থেকে উৎপন্ন হয়ে উত্তর সাগরে গিয়ে মিশেছে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী রাইন। খাদ্য, খনিজ, কয়লা ও তেল পরিবহনের প্রধান এই নৌপথের পানির স্তরও এখন সংকটজনকভাবে কমে গেছে।
সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর ফরেস্ট, স্নো অ্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ রিসার্চের জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ মাসিমিলিয়ানো জাপ্পা বলেন, আল্পসে শীতকালে কম তুষারপাত, বৃষ্টির অভাব এবং রাইন অববাহিকাজুড়ে টানা পাঁচটি তাপপ্রবাহের কারণে নদীর পানির স্তর এত নিচে নেমেছে।
জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলের কোবলেনৎস শহরের কাছে কৌশব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বুধবার পানির গভীরতা ছিল মাত্র ৯ ইঞ্চি। রয়টার্স জানিয়েছে, এর আগে ২০১৮ সালে রেকর্ড সর্বনিম্ন গভীরতা ছিল ৯ দশমিক ৩ ইঞ্চি।
পানির স্তর এতটাই কমে গেছে যে, নাব্যতা ধরে রাখতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য কম বহন করতে হচ্ছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
জার্মান রাসায়নিক প্রতিষ্ঠান লানক্সেস-এর এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, 'বার্জে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। জাহাজগুলো অনেক কম পণ্য নিয়ে চলাচল করছে। কিছু লোডিং ও আনলোডিং পয়েন্টে আর পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাই যেখানে সম্ভব, আমরা রেল ও সড়কপথে পরিবহন করছি।'
জার্মানির কোলন শহর এবং নেদারল্যান্ডসে প্রবেশের আগে রাইনের লোবিথ অংশেও রেকর্ড সর্বনিম্ন পানির স্তর রেকর্ড করা হয়েছে।
শুধু দানিউব বা রাইন নয়, ইতালির পো এবং ফ্রান্সের লোয়ার নদীর অনেক অংশেও পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে এমন রেকর্ড আরও ভাঙতে পারে। ইংল্যান্ডের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞান অধ্যাপক রিচার্ড অ্যালান বলেন, 'জলবায়ু যত উষ্ণ হবে, আমরা এখন যে চরম জলবৈজ্ঞানিক পরিস্থিতি দেখছি, ভবিষ্যতে তা আরও ভয়াবহ হবে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।'
তিনি বলেন, এই চরম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো সমাজের সব খাতে দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো এবং স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা।
অনুবাদ: সাবরিনা রিমি
