‘যেকোনো বিবেকবান মানুষেরই এর নিন্দা জানানো উচিত’: গাজা নিয়ে তথ্যচিত্র বানানো দুই ইসরায়েলি পরিচালকের পাশে চলচ্চিত্র জগৎ
ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র 'নাজা'-র দুই ইসরায়েলি পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোরের বিরুদ্ধে "রাষ্ট্রদ্রোহের" অভিযোগ এনে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি দেওয়ার পর, বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা তাদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
'দ্য গার্ডিয়ান' প্রযোজিত 'নাজা' চলচ্চিত্রটির নামকরণ করা হয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত রূপের নামানুসারে, যা ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা গাজায় বিমান হামলায় আনুমানিক কতজন বেসামরিক মানুষ মারা যেতে পারে তা বোঝাতে ব্যবহার করে থাকে।
তথ্যচিত্রটিতে ২৪ জন ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যের সাক্ষাৎকার রয়েছে, যারা গাজায় বোমাহামলায় ব্যবহৃত এআই-চালিত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। যার ফলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।
এই চলচ্চিত্রটি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম '+৯৭২ ম্যাগাজিন', হিব্রু ভাষার সংবাদ মাধ্যম 'লোকাল কল' এবং 'দ্য গার্ডিয়ান'-এ প্রথম প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত।
৮০ মিনিটের এই তথ্যচিত্রটি গত শনিবারে অনুষ্ঠিত এই বছরের ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে 'বিশেষ জুরি পুরস্কার' লাভ করে। সেখানে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের পর টানা ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে সম্মাননা (স্ট্যান্ডিং ওভেশন) দেওয়া হয়—যা ভেনিস উৎসবের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড। এর পরদিন রবিবার ইসরায়েলের সংস্কৃতিমন্ত্রী মিকি জোহার দুই পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, 'তারা বিশ্বজুড়ে ইহুদি-বিদ্বেষীদের হাততালি পাওয়ার আশায় নিজ মাতৃভূমির ক্ষতি করতেও পিছপা হননি।'
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জোহার লেখেন, 'রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহের অপরাধে আমি এই জঘন্য নির্মাতাদের ইসরায়েলি নাগরিকত্ব অবিলম্বে বাতিল করার ব্যবস্থা নেব।' ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব কর্তৃপক্ষ কিংবা ম্যাগি ইলেনহল-এর নেতৃত্বাধীন জুরি বোর্ড এখনও এই হুমকির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে অস্কারের অন্যতম শীর্ষ সূতিকাগার হিসেবে স্বীকৃত 'টেলুরাইড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল'-এর শৈল্পিক পরিচালক দ্রুতই এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।
জুলি হান্টসিঙ্গার বলেন, 'তথ্যচিত্র নির্মাতারা বর্তমানের সেরা দীর্ঘমেয়াদি সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্ত এবং আমাদের বিশ্বকে অনুধাবনের জন্য তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের হুমকি দেওয়াটাও সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো চিন্তাশীল মানুষেরই উচিত এর তীব্র নিন্দা জানানো।'
তার এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে 'লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভাল'-এর প্রধানরা জানান, তারা কোনো প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই কঠিন ও জরুরি বিষয়গুলো তুলে ধরার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অধিকারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। শৈল্পিক ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা হলো চলচ্চিত্রের মূল ভিত্তি। যা আমাদের বসবাসের এই বিশ্বকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখার ও সংলাপ তৈরির পথ সুগম করে।'
তারা আরও বলেন, 'আমরা সেইসব নির্মাতাদের প্রতি আমাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছি, যারা কঠিন প্রশ্ন তোলেন এবং আমাদের ভাবনাগুলোকে সমৃদ্ধ করতে সাহায্য করেন।'
আগামী সপ্তাহে 'সান সেবাস্তিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল'-এ প্রদর্শন করা হবে 'নাজা'। এক বিবৃতিতে উৎসবটির পরিচালকেরা বলেন, 'চলচ্চিত্রটি ইসরায়েলি সরকার কর্তৃক ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো পদ্ধতিগত গণহত্যাকে উন্মোচিত করে।' তারা চলচ্চিত্রটির নির্মাতাদের পাশাপাশি "ফিলিস্তিনি জনগণের" সাথেও "একাত্মতা" প্রকাশ করেন। চলতি মাসের শেষের দিকে 'নিউ ইয়র্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল'-এ উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ারের আগে আজ রাতে 'বোলোনিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল'-এ তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হবে।
বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক ট্রিসিয়া টাটল বলেন, 'শিল্পীদের অবশ্যই মুক্তভাবে এই বিশ্বকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে দেখার স্বাধীনতা থাকতে হবে। চলচ্চিত্র বিতর্ক, দ্বিমত ও সমালোচনার জন্ম দিতেই পারে; কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শিল্পকর্মের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আলোচনা ও পর্যালোচনা, রাষ্ট্রের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা শাস্তি নয়। বার্লিনালেতে আমাদের পুরো দল ইউভাল আব্রাহাম, র্যাচেল জোর এবং এই অধিকার চর্চাকারী সকল শিল্পীর পাশে রয়েছে।'
আব্রাহাম ও জোর তাদের ফিলিস্তিনি সহ-পরিচালক বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লালের সঙ্গে যৌথভাবে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে নির্মিত 'নো আদার ল্যান্ড' তথ্যচিত্রের জন্য ২০২৫ সালে অস্কার অর্জন করেন।
চলচ্চিত্রটি তার আগের বছর বার্লিনে প্রিমিয়ার হয় এবং সেখানে একটি পুরস্কার জেতে। সেই জয়ের পর আব্রাহামের পারিবারিক বাড়ি এক ডানপন্থী উগ্র জনতার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। গত সপ্তাহে দ্য গার্ডিয়ানকে আব্রাহাম বলেন, 'আমার জন্য সেটি ছিল সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। আমার মা প্রার্থনা করছেন যেন এর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।'
চলতি বছরের শুরুর দিকে সমাপনী সন্ধ্যার পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ থেকে বেশ কয়েকজন বিজয়ী ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানানোর পর টাটলের পদটি হুমকির মুখে পড়েছিল। এর জেরে জার্মানির সংস্কৃতিমন্ত্রী উলফরাম ভাইমার এক জরুরি বৈঠক ডাকেন এবং 'বিল্ড' পত্রিকা রিপোর্ট করে যে "ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য" প্রচারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে টাটলকে চাকরিচ্যুত করা হতে পারে। তবে এই ঘটনার জবাবে ইসরায়েলসহ বিশ্বজুড়ে শত শত বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা টাটলের সমর্থনে এগিয়ে আসেন।
ইসরায়েলে ১,৫০০ জনেরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা পরিচালকদ্বয়ের সমর্থনে এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে একটি আবেদনে (পিটিশন) স্বাক্ষর করেছেন।
স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন চলচ্চিত্রের অন্যতম উদ্যোক্তা লিরান আতজমোর, নাদাভ লাপিদ, অরনা বেন দোর, নেতালি ব্রাউন, রানি ব্লেয়ার, হাগাই লেভি, শাই কারমেলি-পোলাক এবং শলোমি এলকাবেটজ।
পিটিশনে বাকস্বাধীনতা ও শৈল্পিক স্বাধীনতার সমর্থকদের আব্রাহাম ও জোরের প্রতি সংহতি প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়, 'সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমরা এই চলচ্চিত্রের নির্মাতাদের বিরুদ্ধে চরিত্রহনন ও উসকানির এক অভূতপূর্ব প্রচারণার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছি।' একই সঙ্গে বলা হয়, এই ধরনের কথাবার্তা ও হুঙ্কার ক্রমাগত "সহিংসতাকে একপ্রকার বৈধতা দেওয়ার" দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা নির্মাতাদের জীবনের জন্য শারীরিক হুমকি তৈরি করছে।
অস্কার প্রদানকারী সংস্থা 'অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস' তাদের সাম্প্রতিক পুরস্কারপ্রাপ্তদের এই পরিস্থিতির বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তথ্যচিত্র শাখায় আগে অস্কারজয়ী বেশ কয়েকজন নির্মাতা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
উইকিলিকস ও এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিয়ে নির্মিত 'সিটিজেনফোর'-এর জন্য ২০১৫ সালে অস্কারজয়ী লরা পইট্রাস তথ্যচিত্রটির তথ্যের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা রক্ষা করে কথা বলেন।
'নাজা'র পরামর্শক হিসেবে কাজ করা পইট্রাস বলেন, ''নাজা' চলচ্চিত্রে উল্লিখিত বেসামরিক নাগরিকদের গণহত্যার তথ্যগুলো 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর ডজন খানেক কঠোরভাবে সত্যতা-যাচাইকৃত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এবং চলচ্চিত্রের প্রতিটি দাবি একাধিক সূত্রের ওপর ভিত্তি করেই করা হয়েছে।'
ইসরায়েলি সরকারি কর্মকর্তাদের এই হুমকিকে তিনি "বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের জন্য এক আশঙ্কাজনক বার্তা" বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'এই ধরনের আচরণ আমার কাছে পরিচিত—যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) বেআইনি গণ- নজরদারি নিয়ে 'দ্য গার্ডিয়ান'-এ আমার করা প্রতিবেদনের পরও মার্কিন সরকার একইভাবে তা অস্বীকার করেছিল এবং আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমান এই হুমকিগুলোর ভয়াবহতা তো রয়েছেই, তবে একই সাথে এটিও গুরুত্বের সাথে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসরায়েল গাজায় ২০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করেছে এবং সাংবাদিকদের এই হত্যাকাণ্ডকে একপ্রকার স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করেছে।'
এদিকে, লরা পইট্রাসের সাথে ২০২২ সালের অস্কার মনোনীত তথ্যচিত্র 'অল দ্য বিউটি অ্যান্ড দ্য ব্লাডশেড'-এ কাজ করা মার্কিন আলোকচিত্রী ও আন্দোলনকারী নান গোল্ডিন জানান, তিনি 'নাজা'র পরিচালকদের নিজেদের চরম ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরার মতো অভূতপূর্ব সাহসিকতার জন্য সাধুবাদ জানান।
সমর্থন জানানো ব্রিটিশ চলচ্চিত্র অঙ্গনের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে রয়েছেন পরিচালক রিচার্ড এয়ার। তিনি জানান, তিনি ইসরায়েল সরকারের গৃহীত যেকোনো পদক্ষেপে স্তম্ভিত হওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। এছাড়া ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার হানিফ কুরেশি এই দুই পরিচালকের প্রশংসা করে বলেন, 'তারা উভয়ই অত্যন্ত সাহসী ও প্রশংসনীয়, যারা সত্যের অনুসন্ধানে অবিচল থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।'
২০২৩ সাল থেকে গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক—এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাটি যুদ্ধপূর্ব গাজার মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করে। এ হামলায় ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে গাজায় জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। নিহত ও জিম্মিদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক।
