কয়েক দশক ধরে সবচেয়ে ভালো বন্ধু—ডিএনএ টেস্টে জানলেন তারা আপন দুই বোন
ভারতে জন্ম নেওয়া চল্লিশোর্ধ দুই নারী, যাদেরকে শৈশবেই আলাদা দুটি পরিবার দত্তক নেয় এবং নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠেন, অবশেষে তারা জানতে পেরেছেন তারা আসলে আপন দুই বোন।
১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া মীনা গেলটিঙ্ক এবং মিনাল টাইসেনকে তাদের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই পশ্চিম ভারতের মুম্বাই শহরের দুটি আলাদা এতিমখানা থেকে দত্তক নেওয়া হয়েছিল।
তাদের যখন বয়ঃসন্ধিকাল, তখন যে সংস্থার মাধ্যমে তাদের দত্তকের কার্যক্রম হয়েছিল তাদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় দুজনের। প্রথম দেখাতেই নিজেদের চেহারার অদ্ভুত মিল এবং আচার-আচরণের সামঞ্জস্য দেখে তারা বেশ চমকে গিয়েছিলেন।
বর্তমানে ৪৩ বছর বয়সী মীনা সেই দিনের কথা স্মরণ করে বলেন,'দত্তক নেওয়া সব শিশুদের এক জায়গায় এনেছিল—একসাথে সময় কাটাতে, মেশামেশি করতে এবং রাতের খাবার খেতে।'
মীনা এবং মিনাল—দুজনেই সেদিন বন্ধুদের সাথে ছিলেন, এবং সেই বন্ধুরাই প্রথম খেয়াল করেন যে এই দুজনের দেখতে কতটা মিল। তারা বলেছিল, 'তোমরা আয়নায় নিজেদের মুখটা একবার অন্তত দেখো।'
মীনা বলেন, 'আর আমি শুনে বললাম, আরে তাই তো! ওর নাকটা একদম আমার মতো! আমাদের হাসির ধরনও এক। রাতের খাবারের টেবিলে আমি পুরোটা সময় শুধু ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।'
পরদিন দুই কিশোরী একে অপরের ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন এবং যোগাযোগ রাখার কথা দেন। রক্তের সম্পর্ক থাকার কোনো সূত্র বা আভাস না থাকলেও তাদের আত্মিক টান ছিল তাৎক্ষণিক। বহু বছর ধরে তারা একে অপরকে চিঠি লিখেছেন, এবং চিঠিতে প্রায়শই একে অপরকে "সিস" (বোন) বলে সম্বোধন করতেন, কারণ তাদের নিজেদের অনুভূতিটাই তেমন ছিল।
তারা স্কুলের গল্প, বন্ধু-বান্ধব, ছেলেদের কথা, ঘুরে বেড়ানো আর নাচের গল্প নিয়ে চিঠি লিখতেন। নিজেদের খেলাধুলা আর পছন্দের গান নিয়ে কথা বলতেন—এবং জানতে পেরেছিলেন যে দুজনই 'ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ'-এর গান শুনতে পছন্দ করতেন।
তবে আজ থেকে ১৫ বছর আগে হঠাৎ করেই তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে গিয়েছিলেন, আর মীনাও তখন তার প্রথম সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
২০১৭ সালে, মীনা ভারত থেকে আসা দত্তক নেওয়া সন্তানদের আরেক সভায় যোগ দেন। সেখানে তিনি ডিএনএ টেস্টের কথা জানতে পারেন এবং নিজেও পরীক্ষাটি করার সিদ্ধান্ত নেন। তবে তিনি কোনো ম্যাচ পাননি। এমনকি চলতি বছরের শুরুর দিকে ফোনের স্টোরেজ মেমোরি ফুল হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি অ্যাপটি মুছেও ফেলেছিলেন।
এরপর ২০ মে মীনা ফেসবুকে মিনালের কাছ থেকে একটি মেসেজ পান, 'আমাকে মনে আছে?'
মিনাল এপ্রিলে নেদারল্যান্ডসে তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করতে এসে একটি ডিএনএ পরীক্ষা করিয়েছিলেন এবং সেই পরীক্ষার ফলাফলের একটি স্ক্রিনশট মীনাকে পাঠিয়েছিলেন।
মীনা বলেন, 'আমি দ্রুত অ্যাপটি আবার ইন্সটল করলাম। আমি এতটাই নার্ভাস ছিলাম যে লগ-ইন করার আগে টানা ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়েছিলাম।'
ফলাফল ছিল একদম পরিষ্কার—দুই নারীর মধ্যে "শতভাগ মিল" রয়েছে। মীনা বলেন, 'আমার একজন 'বোন' ছিল, যার অর্থ আমাদের জন্মদাতা মা এবং বাবা একই ছিলেন। মনে হচ্ছিল আমার শরীরে অ্যাড্রেনালিনের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। মিনাল ছিল আমার জীবনের সেই হারিয়ে যাওয়া ধাঁধার টুকরো, যার জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করছিলাম।
আমরা তো এতদিন একে অপরকে বোন বলেই ডাকতাম। এই ডিএনএ ম্যাচ ছিল সেই সত্যের সীলমোহর যে আমাদের এতদিনের অনুভূতি এবং অন্তর্দৃষ্টি একদম সঠিক ছিল।' আগস্টের এক মনোরম রোদঝলমলে দিনে, তারা নিজেদের বোন হিসেবে জানার পর প্রথমবারের মতো মুখোমুখি দেখা করেন। তিন সন্তানের জননী মীনা বলেন, 'অনুভূতিটা দারুণ ছিল। মনে হচ্ছিল যেন নিজ ঘরে ফিরে এসেছি। বছরের পর বছর ধরে মিনাল এবং আমি হৃদয়ে এক গভীর শূন্যতা অনুভব করতাম। এখন মনে হচ্ছে আমরা পূর্ণতা পেয়েছি। সবকিছু ঠিক যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, অবশেষে তেমনটাই মনে হচ্ছে।'
তাদের এই "আবেগঘন পুনর্মিলন" নিয়ে রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'তাদের সাক্ষাৎজুড়ে ছিল চোখের জল, আলিঙ্গন আর হাসি... এবং শেষে ছিল একসাথে নেওয়া তাদের প্রথম সেলফি।'
৪৪ বছর বয়সী মিনাল, যিনি তার সঙ্গী এবং দুই ছেলেকে নিয়ে ফ্রান্সে থাকেন, তিনি রয়টার্সকে জানান—এপ্রিলে যখন ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আসে, তখন তিনি প্রথমে বুঝতে পারেননি যে তার এই ম্যাচের সাথে পাওয়া নারী আসলে ৩০ বছর আগে প্রথম দেখায় আঁকড়ে ধরা সেই কিশোরী মেয়েটিই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মীনার ছবিগুলো দেখার পরই বিষয়টি তার মাথায় আসে। তিনি বলেন, 'মীনা: বোন। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। আমরা বোন জানার আগেই বন্ধু ছিলাম।' তিনি আরও বলেন, 'আমরা তো পুরো সময় জুড়ে বোনই ছিলাম, শুধু আমরা সেটা জানতাম না।'
মীনা এবং মিনালকে দুটি আলাদা ডাচ্ (ওলন্দাজ) দম্পতি দুটি ভিন্ন এতিমখানা থেকে দত্তক নিয়েছিলেন।
মীনা জানান, তিনি নেদারল্যান্ডসের একটি ছোট গ্রামে এমন এক মা-বাবার কাছে বেড়ে উঠেছেন যারা একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তিনি বলেন, 'তারা স্কুলেও আমার শিক্ষক ছিলেন। তারা খুব স্নেহপরায়ণ ও বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন।'
কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা যান, তবে তার মা এখনও সেই একই গ্রামে বসবাস করছেন। মীনা বলেন, 'আমাদের প্রতিদিন কথা হয়। তিনি এখনও আমার জীবনের নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল।' ২০০৩ সালে ১৯ বছর বয়সে মীনা তার মা-বাবা এবং গোয়া থেকে দত্তক নেওয়া ভাইয়ের সাথে মুম্বাইয়ের সেই এতিমখানায় গিয়েছিলেন।
তারা টানা দুই সপ্তাহ ধরে নথিপত্র ঘেঁটে মীনার জন্মদাতা মা-বাবার সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মীনার ভাষায়, 'কারণ আমি কোথা থেকে এসেছি বা আমার শেকড় কোথায়—তা জানা আমার জন্য খুব জরুরি ছিল। কিন্তু এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।'
মে মাস থেকে মীনা এবং মিনাল একদিন পর পর কথা বলছেন। তারা ইতোমধ্যে একে অপরের জীবনসঙ্গী, সন্তান, ভাই এবং মা-বাবার সাথেও পরিচিত হয়েছেন। মীনা বলেন, 'আমরা কীভাবে একে অপরের কথা শেষ করি, কীভাবে মাথা নাড়াই কিংবা আমাদের হাঁটার ভঙ্গি কতটা একই রকম—সেটা সবাই খেয়াল করে।'
তারা যে সত্যিই আপন দুই বোন, এই অনুভূতিটা এখনও তারা আস্তে আস্তে উপলব্ধি করছেন বা মানিয়ে নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।"কখনও কখনও আমরা টানা দুই ঘণ্টা কথা বলি এবং সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলি। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যে বাজার করতে হবে কিংবা স্কুল থেকে বাচ্চাদের নিয়ে আসতে হবে।"
মীনা জানান, তিনি এবং তার বোন একটি কাজ খুবই ভালোবাসার সাথে করতে চান, আর তা হলো যেখান থেকে সবকিছুর শুরু হয়েছিল সেখানে ফিরে যাওয়া। তিনি বলেন, 'আমরা দুজন কোনো একদিন একসাথে ভারতে যেতে চাই, একসাথে মুম্বাইয়ের রাস্তাগুলোতে হাঁটতে চাই। এমন কিছু সময় ছিল যখন আমরা দুজনই নিজেদের খুব একা অনুভব করতাম; যেমন—যখন আমি আমার বাবাকে হারালাম বা মন ভাঙার মধ্য দিয়ে গেলাম।
আমার আফসোস হয় যে আমরা তখন একে অপরের পাশে থাকতে পারিনি—আমরা তো নিজেদের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম, কঠিন সময়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারতাম।'
