পাহাড় থেকে সমতলের ‘অপরাধ করিডোর’ বন্ধে এআই ক্যামেরা ও ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা চট্টগ্রাম পুলিশের
পাহাড় ও সমতলের মধ্যে অপরাধীদের চলাচলের সন্দেহভাজন 'করিডর' বন্ধ করতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ চারটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি উত্তর চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় শতাধিক এআই-সক্ষম সিসিটিভি ক্যামেরা ও থার্মাল ড্রোন দিয়ে নজরদারির পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিকল্পনাটি নেওয়া হয়েছে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি উপজেলাকে ঘিরে। পুলিশের দাবি, পাহাড় থেকে নেমে সমতলে অপরাধ করে আবার দুর্গম এলাকায় ফিরে যেতে অপরাধীরা এসব এলাকা যাতায়াতপথ হিসেবে ব্যবহার করছে।
পুলিশ বলছে, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির সঙ্গে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সংযোগকারী সড়ক ও পথগুলো অপরাধীদের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডরে পরিণত হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে এই তিন উপজেলায় ৫০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই আধিপত্য বিস্তার, অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম টিবিএসকে বলেন, "বেশ কিছু ঘটনায় আমরা তথ্য পেয়েছি, পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা অপরাধীরা চট্টগ্রামে এসে কিলিং মিশন পরিচালনা করে আবার পাহাড়ে আত্মগোপন করছে।"
এই করিডরে নজরদারি বাড়াতে রাউজানে একটি, রাঙ্গুনিয়ায় দুটি এবং ফটিকছড়িতে একটি—মোট চারটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাউজানের কদলপুর, রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ও বেতাগী এবং ফটিকছড়ির নাজিরহাটে এসব ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।
প্রতিটি ক্যাম্পে ৫৫ জন করে এপিবিএন সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। সাধারণত একটি প্লাটুনে ৩৩ জন সদস্য থাকলেও এসব এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত সদস্য রাখার পরিকল্পনা করেছে পুলিশ।
স্থায়ী ক্যাম্প চালুর আগ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথগুলোতে রিজার্ভ রেঞ্জ পুলিশ ফোর্সের (আরআরএফ) অস্থায়ী ক্যাম্প ও চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
'অপরাধ করিডরে' এআই নজরদারি
পাহাড় ও সমতলের মধ্যে এই 'অপরাধ করিডর' নিয়ন্ত্রণে জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিতেও জোর দিচ্ছে পুলিশ।
জেলা পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন উপজেলার অপরাধপ্রবণ ২০ থেকে ২৫টি পয়েন্টে শতাধিক এআই-সক্ষম সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। এসব ক্যামেরায় মুখ শনাক্তকরণ বা ফেস রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশ বলছে, তালিকাভুক্ত কোনো অপরাধী এসব এলাকায় প্রবেশ করলে ক্যামেরায় তার মুখ শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
এরই মধ্যে ফটিকছড়ির ডেভিড ইমন ও রাউজানের রাইহানসহ বিভিন্ন অপরাধী চক্রের সদস্যদের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এসব তথ্য ফেস রিকগনিশন সিস্টেমের ডেটাবেজে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া যানবাহনের গতিবিধি নজরদারিতে ভেহিকেল ট্র্যাকার এবং পাহাড় ও বনাঞ্চলে রাতে নজরদারির জন্য থার্মাল ক্যামেরাযুক্ত দুটি উন্নত ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, "বিভিন্ন বনাঞ্চল আছে। ওইসব জায়গায় সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম সার্ভিলেন্স করার জন্য আমরা থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করতে চাই। অনেক দূর থেকে উচ্চ রেজুলেশনে ছবি ধারণ করতে পারে—এমন ড্রোন ব্যবহার করতে পারলে ওই এলাকার নজরদারি আরও কার্যকর হবে।"
তিনি বলেন, "আমাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।"
পাহাড় থেকে অস্ত্র, সমতলে অপরাধ
জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড়ি এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র চট্টগ্রামের সমতলে আসার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন ও সমতলের অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টিও নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ।
পুলিশের ধারণা, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনের সুযোগ এবং পাহাড়-সমতলের বিভিন্ন যোগাযোগপথ কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা সমতলে অপরাধ করে দ্রুত পাহাড়ে ফিরে যাচ্ছে। ফলে শুধু সমতলের অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব চক্র নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিন উপজেলায় ছোট-বড় অন্তত ১৯টি চা-বাগান রয়েছে। পুলিশের একটি প্রতিবেদনে কয়েকটি চা-বাগান ও আশপাশের এলাকাকে অপরাধীদের চলাচলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, এই 'অপরাধ করিডর' বন্ধ করা গেলে হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, অবৈধ বালু উত্তোলন, পাহাড় কাটা এবং কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
ডেভিড ইমন গ্রুপের বিরুদ্ধে মাসে কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ
পুলিশের দাবি, ফটিকছড়ির ডেভিড ইমন গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা চাঁদা তুলত বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থের একটি অংশ বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর কাছে যেত বলেও দাবি পুলিশের।
পুলিশ বলছে, চক্রটি প্রথমে ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করত। এরপর বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে হত্যার হুমকি বা পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করা হতো। টাকা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা বাড়িতে গুলির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন টিবিএসকে বলেন, "তিন উপজেলায় প্রশাসন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। এর ফলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে।"
তিনি বলেন, অপরাধের ধরন, ভৌগোলিক অবস্থান ও অপরাধীদের চলাচলের পথ বিশ্লেষণ করেই পুলিশ সম্ভবত রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব এলাকায় সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গেলে অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে। একই সঙ্গে এটি পুলিশের জন্য একটি 'টেস্ট কেস' হিসেবেও কাজ করতে পারে।
তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং এবং বিশেষায়িত বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের পথগুলোতে নজরদারি জোরদার করতে হবে।
তবে অপরাধের অভিযোগ বা মামলার সংখ্যা বাড়লেই যে অপরাধ বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে না গিয়ে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা বাড়ার কারণে অভিযোগ বেশি হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছাড়া পুলিশকে কাজ করার সুযোগ না দিলে এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।"
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে দুই থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন, এআই-নির্ভর নজরদারি এবং পাহাড়-সমতলের সংযোগপথে নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে উত্তর চট্টগ্রামের এই 'অপরাধ করিডর' নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে জেলা পুলিশ।
