ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস; বন্ধ হলো একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিলের লক্ষ্যে আনা 'ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬' জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আইনের ১৮ক ধারা বিলুপ্ত হওয়ায় একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকদের ফেরার আইনি পথ বন্ধ হলো।
আজ বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এ সময় সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এই বিলের ওপর আলোচনার সময় একজন সাংসদের মন্তব্যকে ঘিরে সংসদে তীব্র হট্টগোলও সৃষ্টি হয়।
আইনের ১৮ক ধারায় একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকদের জন্য সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন এই আইনের অধ্যাদেশ করে, সেখানে এই ধারা ছিল না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই ধারা যুক্ত করে। এরপর ব্যাপক সমালোচনা হয়। সমালোচকদের মতে, এ ধারার মাধ্যমে রেজল্যুশনের আওতায় থাকা ব্যাংকের সাবেক ও বিতর্কিত পরিচালক এবং শেয়ারহোল্ডারদের আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ধারাটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডাররা পুনরায় মালিকানায় ফিরে আসতে পারেন- এমন আশঙ্কা থেকে তখন উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিলটি পাসের সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কারণ, ওই ধারায় নির্ধারিত কঠোর নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এগিয়ে আসেননি।
আমির খসরু বলেন, সংকটে পড়া তফসিলি ব্যাংক পুনর্গঠনে বাজারভিত্তিক বিকল্প কাঠামো দেওয়ার লক্ষ্যে মূলত ১৮(ক) ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট মোকাবিলা করা, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন না করে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ কমানো।
তিনি বলেন, ব্যাংক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শুধু যোগ্য ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ১৮(ক) ধারায় দুই পৃষ্ঠা জুড়ে কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'তবে আইনটি প্রণয়নের পর থেকে কোনো শেয়ারহোল্ডার, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ওই ধারার সব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। ফলে ধারাটির মূল উদ্দেশ্য বাস্তবে অর্জিত না হওয়ায় আমরা এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
এরপর তিনি সংশোধিত বিলটি পাস করার প্রস্তাব করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে এই আইন সংশোধনের বিলের ওপর আলোচনার সময় সংসদে বাদানুবাদ হয়। এই বাদানুবাদের শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ রুমিন ফারহানার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে।
রুমিন ফারহানা বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তার একটি নির্দিষ্ট চরিত্র প্রকাশ পায়, যা অতীতেও দেখা গেছে। এবার বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের রেকর্ড হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, 'প্রতিটা সরকারের একটা চরিত্র থাকে। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট হবে না, এটা হইতে পারে না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর সারের সংকট হবে না, সারে যারা গরীব কৃষক আছেন তারা সার কারখানায় গিয়ে সেটা লুট করবেন না, সেটাও হইতে পারে না।'
তিনি বলেন, 'বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হবে না, সেটাও হওয়া সম্ভব না। বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মত ঋণ খেলাফিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেইটাও হইতে পারে না।'
এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যার যার আসনে বসে হইচই শুরু করেন। তবে রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাব দেননি কেউ।
পরে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় সংসদে যেকোনো সংসদ সদস্যের কথা শোনার দায়িত্ব এবং তার বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অসংসদীয় বক্তব্য এলে স্পিকারের আসন থেকে রুলিং আসতে পারে কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জবাব দিতে পারেন, কিন্তু বক্তব্য পুরোপুরি ঢেকে দেওয়া বা থামিয়ে দেওয়া সংসদীয় রীতির পরিপন্থী। সংসদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে স্পিকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও প্রতিকার দাবি জানান তিনি।
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ব্যাংক রেজুলেশন আইন থেকে ১৮ক ধারা বাদ দেওয়ায় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এই ধারা বাদ দেওয়ার দাবি ছিল বিরোধীদলের। এই ধারা বাদ দেওয়ার মাধ্যমে এস আলমদের ব্যাংকের মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ বন্ধ হলো।
