যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় মুসলিমদের টার্গেট করছে রিপাবলিকানরা, বাড়ছে মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য
চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় মুসলিমদের ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন রিপাবলিকান নেতারা। মিশিগান, টেক্সাস ও আলাবামায় মুসলিম প্রার্থী, মুসলিমদের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্প এবং ইসলামকে ঘিরে সাম্প্রতিক মন্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গত সপ্তাহে এক সমাবেশে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রিপাবলিকান পার্টির সদস্য জেডি ভ্যান্স মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মুসলিম ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদকে 'খুবই খারাপ' ব্যক্তি বলেন।
ডেট্রয়েটের উপকণ্ঠে গত মার্চে একটি সিনাগগে হামলার পর এল-সাইয়েদের কিছু মন্তব্যের কথা উল্লেখ করে ভ্যান্স তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
টেক্সাসে আরেক মেয়াদে গভর্নর হওয়ার জন্য কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট মুসলিমদের নেতৃত্বে একটি প্রস্তাবিত আবাসন প্রকল্পের সমালোচনা করেছেন। সেখানে 'শরিয়াহ আদালত' প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে অভিযোগ তুলে তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রকল্পটির উদ্যোক্তা ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আলাবামার মোট জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা ১ শতাংশেরও কম। সেখানেও গভর্নর পদে দাঁড়ানো রিপাবলিকান প্রার্থী ও বর্তমান সিনেটর টমি টিউবারভিল 'কট্টর ইসলাম'-এর প্রতি ইঙ্গিত করে 'শত্রু আমাদের ঘরের ভেতরেই' বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচনী প্রচারণার ইস্যু মুসলিমরা
রিপাবলিকান নেতাদের এসব মন্তব্য আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মুসলিম ও ইসলামকে নির্বাচনী বিতর্কের অংশ করার প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে কি না, তা নির্ধারিত হবে।
সমালোচকদের মতে, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। তবে রিপাবলিকানদের দাবি, তারা নিরাপত্তা, উগ্রবাদ এবং জনজীবনে ধর্মের ভূমিকা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ তুলে ধরছেন।
টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের মুখপাত্র এদুয়ার্দো লিয়াল বলেন, ওই প্রকল্প নিয়ে গভর্নরের পদক্ষেপ ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে নয়, বরং কথিত বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমের সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। ২০০৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ মুসলিম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। দেশটির প্রতিনিধি পরিষদে কয়েকজন মুসলিম নির্বাচিত হওয়ার পর একের পর এক রাজনৈতিক মাইলফলক তৈরি হয়েছে।
গত বছর জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন মুসলিম মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। আর এল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম। ভার্জিনিয়ায় গাজালা হাশমি লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচিত হয়ে কোনো অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হন।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনেও মুসলিমদের নিয়ে একই ধরনের বক্তব্য দেখা যাচ্ছে।
টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রতিনিধি কিথ সেলফ ও চিপ রয় 'শরিয়াহমুক্ত আমেরিকা ককাস' নামে একটি জোট গঠন করেছেন। আর ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি র্যান্ডি ফাইন যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়াহ আইনের 'বাড়তে থাকা প্রভাব ঠেকাতে' একটি বিল এনেছেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে র্যান্ডি ফাইনের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।
বিতর্কের কেন্দ্রে এল-সাইয়েদ
দেশটির একমাত্র মুসলিম প্রার্থী হিসেবে কোনো অঙ্গরাজ্যজুড়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এল-সাইয়েদ। এ কারণে দেশজুড়ে ইসলামবিরোধী বক্তব্যের অন্যতম 'টার্গেট' হয়ে উঠেছেন তিনি।
মার্চে ডেট্রয়েটের উপকণ্ঠে একটি সিনাগগে গাড়ি নিয়ে হামলার পর এল-সাইয়েদের দেওয়া মন্তব্যকে ঘিরেই মূলত ভ্যান্সের সমালোচনা। ওই সময় ভবনটিতে শিশুরাও ছিল।
এল-সাইয়েদ হামলার নিন্দা করলেও হামলাকারী সম্পর্কে বলেন, 'আহত মানুষই অন্য মানুষকে আঘাত করে।' তিনি জানান, হামলাকারীর লেবাননে থাকা কয়েকজন স্বজন সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন।
পরে এল-সাইয়েদ বলেন, তার মন্তব্য ভুলভাবে নেওয়া হতে পারে। এ জন্য তিনি দুঃখও প্রকাশ করেন।
ভ্যান্সের সমালোচনার জবাবে গত মাসে এল-সাইয়েদ বলেন, 'কাজ করা মানুষের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা কেড়ে নিয়ে বিলিয়নিয়ারদের কর ছাড় দেওয়া—এটাই খারাপ। মানুষ যখন নিত্যপণ্য ও জ্বালানির বাড়তি দাম দিচ্ছে, তখন বাণিজ্যযুদ্ধ ও প্রকৃত যুদ্ধের পথে এগোনোও খারাপ। নিজের স্বার্থে মানুষকে বিভক্ত করাও খারাপ।'
বামপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনফ্লুয়েন্সার হাসান পাইকারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণেও রিপাবলিকানদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন এল-সাইয়েদ। পাইকার এর আগে বলেছিলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার জন্য দেশটি নিজেই দায়ী।
এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে এল-সাইয়েদ কিছু আমেরিকানের একাকিত্বের কথা বলেন। এর জন্য তিনি মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করেন। বিপরীতে, মিশরে থাকা তার স্বজনদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
এর জবাবে টিউবারভিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, 'আপনি যদি আমেরিকাকে এতই ঘৃণা করেন, তাহলে মিশরে গিয়ে থাকুন।'
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে টিউবারভিলের নির্বাচনী প্রচারণা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আছে। তার জনপ্রিয়তার হার প্রায় ৩৩ শতাংশে আটকে আছে। মানুষের প্রধান উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং বিদেশি পণ্যে ট্রাম্পের শুল্ক।
ইসরায়েল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মনোভাবও বদলেছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতাও বাড়ছে।
রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক ও ইসলাম-ইহুদি ধর্মের গবেষক অ্যারন হিউজ জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসনের মতো ইস্যুতে রিপাবলিকানরা রাজনৈতিকভাবে সুবিধা করতে না পারায় মুসলিমদের নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আপনি যদি জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিতে পারেন এবং মুসলিম ও ইসলামকে আক্রমণ করেন, তাহলে এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আপনাকে আর কথা বলতে হয় না।' তিনি এটিকে 'ভয় ছড়ানোর রাজনীতি' বলে উল্লেখ করেন।
হিউজ বলেন, 'একটি পুরো সম্প্রদায়কে ভুলভাবে তুলে ধরে তাদের সঙ্গে হামাস ও ইরানের যোগসূত্র তৈরি করা হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এসব বিষয়কে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।'
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের নিশানা করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এ জাতীয় বক্তব্য আরও বেড়েছে।
ঠিক দুই বছর আগে ট্রাম্পসহ কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী ওহাইওর ছোট শহর স্প্রিংফিল্ডে বসবাসকারী হাইতিয়ান অভিবাসীদের নিয়ে মিথ্যা দাবি ছড়িয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, এসব অভিবাসী মানুষের পোষা প্রাণী খেয়ে ফেলছে।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিতর্কে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'ওরা কুকুর খাচ্ছে! যারা সেখানে এসেছে, তারা বিড়ালও খাচ্ছে! তারা সেখানকার মানুষের পোষা প্রাণী খাচ্ছে।'
এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন। তবে তার কাজের প্রতি মানুষের কম সমর্থন অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীদেরও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সহসভাপতি আশিক সিদ্দিক বলেন, শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে ইসলামবিদ্বেষের জন্য দায়ী করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, 'দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ডেমোক্র্যাট দলের নেতাদের কেউ কেউও এই ইসলামবিরোধী বক্তব্যকে উসকে দিয়েছেন।'
তিনি গত বছরের অক্টোবরে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার সময় অ্যান্ড্রু কুওমোর দেওয়া একটি রেডিও সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেন। ওই নির্বাচনে কুওমোকে হারিয়ে মেয়র হন জোহরান মামদানি।
ওই সাক্ষাৎকারে কুওমো অনুষ্ঠানের উপস্থাপককে প্রশ্ন করেছিলেন, '২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সময় মামদানি যদি ওই পদে থাকতেন, তাহলে কী হতো—কল্পনা করতে পারেন?'
নির্বাচনী প্রচারণার বাইরেও বিতর্ক
মুসলিমদের নিয়ে এই বিতর্ক শুধু নির্বাচনী প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
আগস্টে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট রাজ্যের দুটি বিমানবন্দরে ইসলামি রীতিতে অজু করার ব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তের দাবি জানান। তার যুক্তি, সরকারি মালিকানাধীন বিমানবন্দর কোনো একটি ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে না।
তবে অ্যাবটের নির্বাচনী প্রচারশিবির মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হিউস্টনের ডেমোক্র্যাট মেয়র জন হুইটমায়ার বলেন, বিমানবন্দর দুটির অজুর স্থান ও পাশের নামাজের কক্ষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব যাত্রী, কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ত।
তিনি বলেন, 'কেউ বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন না, আবার কাউকেও প্রবেশ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না।'
