‘পুলিশ বলে, তুই বাচ্চা হারাইছিস তো আমি কী করব?’: সংবাদ সম্মেলনে নিখোঁজ সন্তানের অভিভাবক
'পুলিশ বলে, তুই বাচ্চা হারাইছিস তো আমি কী করব?'—কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ঝিনাইদহের খাজুরা গ্রামের কাপড় বিক্রেতা হোশেন আলী। দেড় মাস আগে তার ১২ বছরের ছেলে মো. আলী নিখোঁজ হয়েছে।
নিখোঁজ শিশুদের সন্ধান, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দাবিতে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) জিরো মিসিং চিল্ড্রেন আয়োজিত 'আমার সন্তান কোথায়?' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি।
সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর নিকটস্থ থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিন দিন ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে বলে অভিযোগ হোশেনের। এরপর জিডি নেওয়া হলেও পুলিশ আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় পথে পথে ঘুরছেন এই বাবা। আর্থিক সংকটের মধ্যেও ধার-দেনা করে ছেলের নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি ছাপাচ্ছেন তিনি। তার একটাই আকুতি—সন্তানকে খুঁজে দেওয়া হোক।
শুধু হোশেন আলী নন, একই অপেক্ষায় দিন কাটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আরও বহু পরিবারের। সাভারের বলিয়ারপুরে নিজ বাসা থেকে গত ৩০ জুলাই নিখোঁজ হয় চার বছরের যাদব কর্মকার। শিশুটির মা বাসনা কর্মকারের অভিযোগ, ফোনে হুমকি পাওয়ার পর সন্দেহভাজনদের তথ্য পুলিশকে দেওয়া হলেও তদন্তে কার্যকর অগ্রগতি নেই। এক মাস ধরে সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় ছুটছেন তিনি।
কামরাঙ্গীরচরের তিন বছরের শিশু সামিয়াও নিখোঁজ ১১৫ দিন ধরে। মায়ের অভিযোগ, বাসার সামনে খেলতে গিয়ে হারিয়ে যায় শিশুটি। এরপর পুলিশের একেকজন কর্মকর্তা একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। পরে শিশুটিকে 'মিঠাই' নামে টিকটকে দেখা গেলেও বিষয়টি জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি পরিবারের। মামলা ডিবি ও পরে পিবিআইতে গেলেও সন্তানের সন্ধান মেলেনি।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শিশু নিখোঁজ-সংক্রান্ত ১৫ হাজার ৭১৭টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ ২ হাজার ৩৮ জন।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'অনলাইন জিডির ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো জিডি প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
তার ভাষ্য, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাই শিশু। প্রেম করে চলে যাওয়া, অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কিংবা অন্য কারণে নিখোঁজ হওয়া—বিভিন্ন ধরনের ঘটনাই মিসিং জিডিতে আসে।
শিশু নিখোঁজ নিয়ে নতুন কোনো বিশেষ তৎপরতা চালু হবে কি-না জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, 'পুলিশের আরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তবে বিষয়টির প্রতি পুলিশের 'সেনসিটিভিটি' রয়েছে।'
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রায় ৪০টি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, নিখোঁজ শিশুদের দ্রুত উদ্ধার, দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর পুনঃতদন্ত এবং শিশু নিখোঁজ ও পাচার প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে পরিবারগুলোর।