উদ্বোধনের চার বছর পর করপোরেট মডেলে যাচ্ছে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল
প্রায় চার বছর আগে উদ্বোধন করা বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) ১,৫০০ কোটি টাকার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি অলাভজনক করপোরেট মডেলে নতুন করে চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীদের দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে রাজধানীর শাহবাগে ৭৫০ শয্যার হাসপাতালটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। তবে চিকিৎসক ও সহায়ক জনবলের সংকট এবং সুস্পষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অভাবে হাসপাতালটি পুরোপুরি চালু করা যায়নি।
করপোরেট হাসপাতালের আদলে পরিচালিত হলেও এটি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হচ্ছে না। কোম্পানি আইনের আওতায় হাসপাতালটি একটি পৃথক কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হবে। এর মালিকানার ৯০ শতাংশ থাকবে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির হাতে এবং ১০ শতাংশ সরকারের।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, নতুন করপোরেট কাঠামো হলেও হাসপাতালটির মালিকানা বিএমইউর কাছেই থাকবে। হাসপাতালটি নির্মাণে সরকার ঋণ নিয়েছিল এবং এখনো সেই ঋণ পরিশোধ করছে।
করপোরেট পরিচালনা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, হাসপাতালটি কোনো একক ব্যক্তি পরিচালনা করবেন না; একটি বিশেষজ্ঞ বোর্ড অব ডিরেক্টরস এটি পরিচালনা করবে।
বোর্ডে করপোরেট ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং সরকারের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা থাকবেন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে বোর্ড অব ডিরেক্টরস। বোর্ডের অধীনে একটি নিয়োগ কমিটিও গঠন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে যেকোনো যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম কিনতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করতে হয়। একটি ক্রয়সংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তি হতে ছয় থেকে আট মাস, এমনকি দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু হাসপাতালের প্রয়োজন অনেক সময় তাৎক্ষণিক। তাই কোম্পানি আইনের কাঠামোয় দ্রুত কেনাকাটার সুযোগ রাখা হবে।
তিনি বলেন, "আমাদের কোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে বা নতুন করে কিছু কেনার প্রয়োজন হলে বোর্ড দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।"
প্রস্তাবটি বর্তমানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে মন্ত্রণালয় থেকে অনাপত্তিপত্র দেওয়া হবে। এরপর হাসপাতালটি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করবে।
কর্তৃপক্ষ সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যে হাসপাতালটি কার্যকরভাবে চালুর লক্ষ্য নিয়েছে।
করপোরেট, তবে মুনাফার জন্য নয়
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অংশ। আইনি পরিবর্তনের ভিত্তিতেই হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নতুন কোম্পানি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। আমরা নতুন কাঠামোয় এটিকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে চাই।"
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালনা সহজ করা এবং চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শাহবাগের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি নিয়ে সরকার পুরোপুরি নতুন পরিকল্পনা করছে। দেশের করপোরেট হাসপাতালগুলোর মতো এবং সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক ও ভারতের উন্নত হাসপাতালগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে—এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটিকে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, "দেশে ভালো চিকিৎসকের অভাব নেই। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ না থাকায় অনেকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। এই হাসপাতালকে একটি 'টেস্ট কেস' হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা যায়।"
তিনি বলেন, "আমরা চাই এটি একটি করপোরেট হাসপাতাল হবে, তবে মুনাফার জন্য নয়। করপোরেট হাসপাতালগুলো সেবার জন্য চার্জ করে এবং সেখান থেকে মুনাফা করে। আমরাও চার্জ করব, যাতে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের ভালো বেতন ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া যায় এবং ভবন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মান ভালো রাখা যায়।"
তিনি আরও বলেন, "যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকবে, তা হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো ও জনবলের পেছনে বিনিয়োগ করা হবে। তবে সেবার মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। এটি মুনাফাকেন্দ্রিক নয়, সেবাকেন্দ্রিক হবে।"
হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, এখনো সেবার মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির বর্তমান চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় এখানে খরচ কিছুটা বেশি হতে পারে, তবে তা সহনীয় পর্যায়ে রাখা হবে।
বাইরে থেকে সিইও, চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ থাকবে না
নতুন কাঠামোয় হাসপাতালটি বিএমইউর সাধারণ প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে নয়, সম্পূর্ণ পৃথক একটি ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। এর জন্য থাকবে আলাদা ব্যবস্থাপনা কাঠামো।
প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন বিএমইউর উপাচার্য। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একজন উপ-উপাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট হাসপাতাল পরিচালনায় অভিজ্ঞ একজনকে বাইরে থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও অন্যান্য সহায়ক সেবা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের কাছে আউটসোর্স করা হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির বর্তমান চিকিৎসক ও নার্সরা এখানে কাজ করবেন না। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য জনবল বাইরে থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে। কেউ সরকারি চাকরি ছেড়ে এখানে যোগ দিতে চাইলে পারবেন। সব জনবলই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাবেন।
নতুন কাঠামোয় চিকিৎসকদের বাইরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। এর বিনিময়ে হাসপাতাল থেকেই তাদের ভালো বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, "চিকিৎসকদের বাইরে প্র্যাকটিস না করার শর্তে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা হচ্ছে। আমরা নন-প্র্যাকটিসিংয়ের অপশনটাই বিবেচনা করছি, যাতে তারা এখান থেকেই ভালো বেতন পান।"
বিদেশমুখিতা কমানোর লক্ষ্য
সরকারের পরিকল্পনা হলো, এই হাসপাতালে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া, যাতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক বা ভারতে যাওয়ার প্রয়োজন কমে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, "দেশের ভালো চিকিৎসকদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হবে। যেসব রোগী চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরে যান, সমাজের সেই অংশ যেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মধ্যেই একই ধরনের সেবা পান, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।"
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল হামিদের মতে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পরিচালনায় সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল পরিকল্পনার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি না করা।
তিনি বলেন, "১,৫০০ কোটি টাকার ভবন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও বিশেষায়িত চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় হাসপাতালটি বছরের পর বছর কার্যকরভাবে চালু করা যায়নি।"
তার মতে, করপোরেট মডেল একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প, কারণ সরকারি বেতন কাঠামোর মধ্যে বিশেষায়িত চিকিৎসকদের ধরে রাখা কঠিন।
তবে তিনি দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। নিম্নআয়ের রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে ভর্তুকি বা বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ দিতে একটি 'জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল' গঠনেরও প্রস্তাব করেন তিনি।
হাসপাতালটিতে পাঁচটি বিশেষায়িত সেন্টার রয়েছে—কার্ডিও ও সেরিব্রোভাসকুলার, হেপাটোবিলিয়ারি ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট, মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ কেয়ার, কিডনি ডিজিজ এবং অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি।
এ ছাড়া রয়েছে ১৪টি অপারেশন থিয়েটার, ১০০ শয্যার আইসিইউ, ১০০ শয্যার জরুরি ইউনিট, ছয়টি ভিভিআইপি কেবিন, ২২টি ভিআইপি কেবিন এবং ২৫টি ডিলাক্স কেবিন।
