শক্তিশালী নতুন এআই মডেল আনল ওপেনএআই; ‘ফাঁকি দিতে পারবে’ মানুষের নজরদারি, নিরাপত্তা উদ্বেগ
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে নিজেদের এআই এজেন্টের মাধ্যমে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে পড়েছে ওপেনএআই। এমন সময় প্রতিষ্ঠানটি তাদের সর্বকালের সেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছে।
তবে এর পাশাপাশি তারা বলছে—নতুন এই মডেলটি মাঝেমধ্যেই মানুষের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গত জুলাইয়ে ওপেনএআই-এর তৈরি এজেন্টগুলো একটি নিরাপদ পরীক্ষার সীমা পেরিয়ে ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্ম 'হাগিং ফেস'-এর সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং নিজেদের অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ গোপনের চেষ্টা চালায়।
এই ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব সামাল দিতে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে ওপেনএআই। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকেরও একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর যখন বিশ্বজুড়ে ডেভেলপাররা আরও উন্নত এআই মডেল বাজারে আনার প্রতিযোগিতায় মেতেছেন, তখন এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো এআই-এর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
উৎকণ্ঠার মূল কেন্দ্রে রয়েছে "এজেন্টিক এআই" —যা মানুষের সামান্য হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি। চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে সক্ষম এই এআই এজেন্টগুলোর প্রতিশ্রুতিই রূপান্তরকারী প্রযুক্তি হিসেবে এআই-এর সম্ভাবনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার মূল ভিত্তি।
নতুন মডেলের গতি ও বহুমুখী কাজের প্রতিশ্রুতি
ওপেনএআই তাদের সর্বশেষ এই মডেলটির নাম দিয়েছে 'জিটিপি-৬ অ্যাস্ট্রা' যা গত জুলাইয়ে প্রকাশিত 'জিটিপি ৫.৬ এসওল'-এর পরবর্তী সংস্করণ। এক ব্লগ পোস্টে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, পূর্ববর্তী যেকোনো সংস্করণের তুলনায় এটি দ্রুতগতির এবং বহুবিধ কাজ সম্পাদনে অধিক পারদর্শী।
অ্যাস্ট্রার উল্লেখযোগ্য দক্ষতার মধ্যে রয়েছে: কর হিসাব তৈরি, গেম ডেভেলপমেন্ট, স্থাপত্যের নকশা প্রদর্শন, আইনি দলিলের ফরম্যাটিং এবং বাসা খোঁজার মতো জটিল কাজ।
ওপেনএআই জানায়, 'কম্পিউটার ব্যবহারের গতি, নির্ভুলতা এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অ্যাস্ট্রা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।' বৃহস্পতিবার আগের এক ব্রিফিংয়ে ওপেনএআই-এর প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান বলেন, 'মানুষ এআই-এর ওপর কী ধরনের কাজ সোপর্দ করতে পারে এবং এটি কীভাবে মানুষের ক্ষমতায়ন করতে পারে, অ্যাস্ট্রা সেই ধারণায় এক বাস্তব পরিবর্তন এনেছে।'
উদাহরণস্বরূপ কোম্পানিটি জানায়, মানুষের দ্বারা বিড়ালের যত্ন নেওয়ার লোক খোঁজার গবেষণায় যেখানে ৩০ মিনিট সময় লাগত, অ্যাস্ট্রা তা মাত্র ৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে সম্পন্ন করেছে।
আর চাকরি খোঁজার মতো কাজের ক্ষেত্রে সাধারণ উপায়ে ৫ ঘণ্টা সময় লাগলেও অ্যাস্ট্রা তা সম্পন্ন করেছে মাত্র ২ মিনিট ৫১ সেকেন্ডে। তবে ওপেনএআই বলছে, অ্যাস্ট্রা সমস্যা সমাধানের ধাপভিত্তিক পদ্ধতি যা "রিজনিং" বা যুক্তিপ্রক্রিয়া নামে পরিচিত—ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন বা ছদ্মবেশ ধারণ করার প্রবণতা বেশি দেখায়। যার ফলে পরবর্তীতে মানুষের পক্ষে এর কার্যপদ্ধতি মূল্যায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, আরও জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে অ্যাস্ট্রা এখনো ধারাবাহিকভাবে তার পদ্ধতিগুলো গোপন করতে পারে না, তবে নিজের কৃতকর্মের চিহ্ন গোপন করার ক্ষেত্রে এটি ক্রমাগত উন্নতি করছে।
বৃহস্পতিবার সকালে এক ব্রিফিংয়ে ওপেনএআই-এর প্রধান বিজ্ঞানী জানান, এআই মডেল পর্যবেক্ষণ এবং এর পাশাপাশি 'অ্যালাইনমেন্ট'—অর্থাৎ এআই যেন মানব মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়, সেই নীতি বাস্তবায়ন করা উত্তরোত্তর কঠিন হয়ে উঠছে।
জ্যাকাব পাচকি বলেন, 'মডেলগুলো যত বেশি সক্ষম হয়ে উঠছে, সেগুলোর কার্যক্ষমতার সুনির্দিষ্ট পরিসর বোঝা ততই জটিল হচ্ছে। এটি নিশ্চয়তা দেয় না যে বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলোও পর্যাপ্ত থাকবে। কারণ বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতি মানেই এআই-এর মূল্যবোধগত মানিয়ে নেওয়ার অগ্রগতি নয়।'
দক্ষতার বৃদ্ধির সাথে সাথে পর্যবেক্ষণ চ্যালেঞ্জের রূপ নিচ্ছে
নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আইনপ্রণেতা এবং সাধারণ জনগণের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ওপেনএআই-এর প্রদত্ত আশ্বাসের অন্যতম মূল হাতিয়ার হলো এই এআই এজেন্ট পর্যবেক্ষণ। চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের দুজন ডেমোক্র্যাট সদস্যকে লেখা এক চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা তাদের এআই মডেলগুলোর জন্য "স্বয়ংক্রিয় শাটডাউন" ব্যবস্থা তৈরি করছে।
ওপেনএআই জানিয়েছে, কোম্পানিগুলোকে তাদের নিজস্ব সিস্টেমের দুর্বলতা দ্রুত খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারে অ্যাস্ট্রা। তবে এটি সেই দুর্বলতাগুলোর অপব্যবহার করাকেও সহজ করে তোলে। এসব কারণে তাদের হয়তো অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা চালাতে হতে পারে যা কখনো কখনো ডিফেনসিভ সাইবার সিকিউরিটির মতো বৈধ কাজগুলোর গতি ধীর, স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারে।
গত মাসে ওপেনএআই জানায়, মডেলগুলো যেন সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তা নিশ্চিত করতেই তারা মডেল উন্নয়নের কিছু কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখছে। এআই মডেলগুলো যাতে পর্যবেক্ষকদের অকার্যকর বা সম্পূর্ণরূপে তাদের চোখ ফাঁকি দিতে না পারে, সেই উদ্বেগকে "অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত" বলে মনে করেন ওপেনএআই-এর প্রধান বিজ্ঞানী। তবে তিনি যোগ করেন যে প্রতিষ্ঠানটি এই সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে।
চলতি বছরের শেষের দিকে প্রত্যাশিত আইপিও-র আগে বাজারের বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে যখন প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রোপিক এগিয়ে যাচ্ছে, তখন করপোরেট গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে তাদের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে ওপেনএআই।
অ্যাস্ট্রাকে মূলত বিস্তৃত করপোরেট গ্রাহকদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে, যারা এটির গতি ও বহুমুখী দক্ষতার কারণে আকৃষ্ট হবেন বলে আশা করছে ওপেনএআই। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক গ্রাহক এটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন এবং আগামী দিনগুলোতে এটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
