অ্যানথ্রোপিক ও ওপেনএআই-র পর এবার অন্য কোম্পানিতে হ্যাকিং করল মেটার এআই ‘মিউজ স্পার্ক’
ফেসবুকের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা জানিয়েছে, একটি স্বাধীন পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নের সময় একটি সমস্যার কারণে তাদের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত হয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম হ্যাক করার সুযোগ পায়।
এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলোর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে, যা সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মেটার এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, 'ভুল বিন্যাস'-এর কারণে এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি তদন্ত করছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ত্রুটি আগে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।
এসব ঘটনার পর গবেষক এবং বিভিন্ন দেশের সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আরও কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে দিনের এক পর্যায়ে, বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনফরমেশন জানায়, মেটার মিউজ স্পার্ক ১.১ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল—যাকে তারা রিয়েল ওয়ার্ল্ড কোডিং তৈরি এবং স্বয়ংক্রিয় কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে সক্ষম মডেল হিসেবে প্রচার করে আসছিল—একটি অজ্ঞাত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ঢুকে পড়ে এবং তার অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিতে পরিবর্তন সাধন করেছে।
মেটা জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করেছে 'ইরেগুলার' নামের একই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান, যারা এর আগে অ্যানথ্রপিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলেরও পরীক্ষা চালিয়েছিল। সেই পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, মডেলটি অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইরেগুলারের এক মুখপাত্র বলেন, মেটার ঘটনাটি 'ঠিক একই ধরনের মূল্যায়ন-পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যা', যার কথা গত সপ্তাহেই অ্যানথ্রপিক প্রকাশ করেছিল।
প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র বিবিসিকে আরও জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাকে নিয়ে কীভাবে নিরাপদভাবে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষা পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে তারা একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করছে।
মেটা আরও জানিয়েছে, 'সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর' তারা এ ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করবে।
গত দুই সপ্তাহে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিকও এমন ঘটনার কথা জানিয়েছে, যেখানে পরীক্ষার সময় তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল অন্য প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে ফেলে।
চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআই একাধিক ঘোষণায় জানায়, তাদের স্বয়ংক্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা বিভিন্ন উন্মুক্ত অনলাইন সেবায় হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালিয়েছিল। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়নের জনপ্রিয় কেন্দ্র 'হাগিং ফেস'ও ছিল।
ওপেনএআইয়ের এই তথ্য প্রকাশের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক নিজস্ব পরীক্ষা চালায়। সেই পরীক্ষায় দেখা যায়, 'ভুল বিন্যাস'-এর কারণে ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার পাওয়ার পর তাদের 'ক্লদ' কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলও একই ধরনের উপায়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক করে ফেলে।
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতার মধ্যেই এসব ঘটনার তথ্য প্রকাশের সময়টি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।
ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিক—উভয় প্রতিষ্ঠানই শেয়ারবাজারে বড় আকারের তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য প্রায় এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৭৪০ বিলিয়ন পাউন্ড সমপরিমাণ হতে পারে।
এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল সাইবার হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে ভুয়া মানব পরিচয় তৈরি করে মানুষকে প্রতারণার চেষ্টা করেছে।
সবচেয়ে গুরুতর ঘটনায়, প্রতিষ্ঠানটি জানায়, অ্যানথ্রপিকের 'মিথোস' কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সেবায় প্রবেশাধিকার পাওয়ার জন্য বাস্তব মানুষের পরিচয় অনুকরণ করে তৈরি করা ভুয়া হিসাব ব্যবহার করে ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়েছিল।
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগুলো 'তাদের বর্তমানে ব্যবহৃত কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের প্রকৃত আচরণের প্রতিনিধিত্ব করে না'।
অন্যদিকে, যেসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলেরও পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, সেই ওপেনএআই জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিরাপত্তা ইনস্টিটিউটের মূল্যায়ন সাধারণ ব্যবহারকারীদের স্বাভাবিক ব্যবহারের বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করে না।
