দাস ব্যবসার ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করতে ব্রিটেনকে আফ্রিকানদের ভাস্কর্য নির্মাণ করতে বলল জাতিসংঘ; বলল আর্থিক ক্ষতিপূরণের কথাও
দাস ব্যবসার 'প্রায়শ্চিত্ত' হিসেবে যুক্তরাজ্যকে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ প্যানেল। এ সংক্রান্ত 'ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচার' একটি নির্দেশিকা জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত কমিটি এলিমিনেশন অব রেশিয়াল ডিসক্রিমিনেশন (সিইআরডি)-এ প্রকাশিত হেয়েছে।
সিইআরডি'র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক দাস-ব্যবসায়ী দেশগুলোর 'নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা' রয়েছে এই অন্যায়ের ক্ষয়ক্ষতির প্রায়শ্চিত্ত করার। এর অংশ হিসেবেই সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থানগুলোতে আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের অবদানকে সম্মান জানিয়ে ভাস্কর্য ও শিল্পকর্ম স্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
গত মার্চে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণের দাবিতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভোটের ওপর ভিত্তি করেই এই নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলটি ২০২০ সালের 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' বিক্ষোভ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের বরাতে এই দাবিকে সমর্থন করেছেন। ওই সময় বিক্ষোভে দাসপ্রথার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাস্কর্যও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। তার মধ্যে ব্রিস্টলে ফেলে দেওয়া দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কোলস্টনের ভাস্কর্যও ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যেসব বিক্ষোভকারী এ ধরনের ব্যক্তিদের ভাস্কর্য ভাঙচুর করেছিল, সংবাদমাধ্যমে তাদের ভূলভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে 'অবমূল্যায়ন' করা হয়েছে এবং তাদের উদ্দেশ্যকে অহেতুক 'অস্পষ্ট' ও 'বামপন্থী' হিসেবে উপস্থারপন করা হয়েছে।
জাতিসংঘের অভ্যন্তরীন সূত্র জানিয়েছে, আফ্রিকানদের জন্য গণসম্মানের সুনির্দিষ্ট রূপ কী হবে তা সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মতো নির্ধারণ করবে।
তাই শুধু কৃষ্ণাঙ্গদের সম্মানিত করাই নয়, বরং যেসব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এসব অমানবিক কর্মকাণ্ড থেকে লাভবান হয়েছেন বা সমর্থন দিয়েছেন, স্মারকগুলোতে তাদের অপরাধের ইতিহাসও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সুপারিশ করা হয়েছে।
মার্কিন আইনজীবী গে ম্যাকডুগাল এবং লাইবেরিয়ার আইনি বিশেষজ্ঞ পেলা বোকার-উইলসন দ্বারা গঠিত জাতিসংঘের এই প্যানেল স্পষ্ট করেছে, 'ক্ষতিপূরণমূলক বিচার' কেবল অর্থ হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সমাজব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি অন্যতম মাধ্যম।
প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে ঘৃণাত্মক বক্তব্য রোধে আইন প্রয়োগ করা এবং শিশুদের পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পুনর্মূল্যায়ন করা।
জাতিসংঘের নির্দেশনায় বলা হয়, ক্ষতিপূরণ নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত অভিবাসী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বিদ্বেষ দূর করা।
জনগণকে শিক্ষিত করার আহ্বান
জাতিসংঘের ওই নীতিমালায় ঘৃণাত্মক বক্তব্য মোকাবিলা, জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের মতাদর্শ এবং দাসপ্রথা সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কমিটি বলেছে, ব্রিটেনসহ সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে, যেন পাঠ্যক্রমে গবেষণানির্ভর ও নিরপেক্ষ ইতিহাস তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে ক্ষতিপূরণমূলক বিচারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা।
তবে কেমব্রিজের ইতিহাসবিদ ও 'হিস্ট্রি রিক্লেম' গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক রবার্ট টম্বস এই উদ্যোগের সমালোচনা করে একে 'অশুভ' প্রচারণা বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এর মূল উদ্দেশ্য হলো মুক্ত আলোচনাকে সেন্সর করা এবং নির্দিষ্ট একটি দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া।
অধ্যাপক টম্বসের মতে, দাসপ্রথায় যাদের ভূমিকা ছিল, তাদের উত্তরসূরিরাই এখন ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। একটি নিরপেক্ষ ইতিহাসে ব্রিটিশ দাসপ্রথাবিরোধী সংগ্রামীদের পাশাপাশি তৎকালীন কৃষ্ণাঙ্গ দাস ব্যবসায়ীদের প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধার বিষয়টিও উঠে আসা উচিত। তিনি একে এক ধরণের 'আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতারণা' বলে আখ্যা দেন।
'বর্তমান দাসপ্রথা নিয়ে কাজ করার পরামর্শ'
অক্সফোর্ডের সেন্ট পিটার্স কলেজের ইমেরিটাস ফেলো অধ্যাপক লরেন্স গোল্ডম্যানও এই নির্দেশনার সমালোচনা করে বলেন, 'এটি একটি চরম পরিহাস। ২০০ বছর আগে ব্রিটেনেই দাসপ্রথাবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল এবং ভিক্টোরীয় যুগে তারা বিশ্বজুড়ে এর অবসানে নেতৃত্ব দিয়েছে।'
তিনি বলেন, 'বিশ্বজুড়ে এখনো লাখ লাখ মানুষ আধুনিক দাসত্বের শিকার। তাই অতীতের বিষয় নিয়ে যুক্তরাজ্যকে পরামর্শ না দিয়ে জাতিসংঘের উচিত বর্তমানে বিদ্যমান দাসপ্রথা নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।'
প্রতিবেদনে কেবল সরকারি পর্যায়েই নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের দাসব্যবসায় সম্পৃক্ততা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ রাজার আসন্ন ক্যারিবিয়ান সফরের আগে রাজপরিবারের অতীত ভূমিকা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, তৎকালীন 'রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানি'কে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে রাজপরিবার কতটা লাভবান হয়েছিল তা নিয়ে গবেষণা চলছে। জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা সব প্রতিষ্ঠানকে কোনো তথ্য গোপন বা পরিবর্তন না করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন।
এই সুপারিশমালাটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো হবে, যা ভবিষ্যতে ক্যারিবিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ দাবির ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) মাধ্যমে ব্রিটেনকে ক্ষতিপূরণে বাধ্য করতে একটি আইনি মামলা প্রস্তুত করছে।
এর আগে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ হস্তান্তরে ব্যবহৃত আইনি কৌশলটিকেই এখানে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ঘানার নেতৃত্বে কমনওয়েলথভুক্ত বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এই ক্ষতিপূরণের দাবির পক্ষে সমর্থন দিয়েছে।
