দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’, ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালার প্রয়োজন: বিইআরসি চেয়ারম্যান
দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিকে 'উদ্বেগজনক' বলে অভিহিত করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সংকট কাটাতে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস অনুসন্ধান, এলএনজি অবকাঠামো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগসহ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
আজ শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) 'ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি' আয়োজিত ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতা-২০২৬ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসি চেয়ারম্যান এই মন্তব্য করেন।
১৯৯৬ সালে সর্বশেষ প্রণীত জ্বালানি নীতির পর নতুন কোনো নীতি না হওয়ায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এবারের বিতর্কের বিষয় ছিল—'নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগই নিশ্চিত করবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা'। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সরকারি বাংলা কলেজ বিজয়ী এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ (নিটার) রানার-আপ হয়। এতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দ্য বাংলাদেশ পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাদরুল হাসান, বাংলাভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি রিশান নাসরুল্লাহ, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি রফিকুল বাসার, দ্য ডেইলি নিউজ মেইলের সম্পাদক আতিকুর রহমান এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সিনিয়র স্টাফ করেসপন্ডেন্ট সাজ্জাদ হোসেন।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ টেনে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আমদানিকৃত জ্বালানি ও এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সামান্য অস্থিতিশীলতাও বাংলাদেশকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে দেশের নিজস্ব গ্যাস সম্পদ অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত জোর না দিয়ে আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'আমাদের বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) রয়েছে, যেখানে মূলত আমাদের প্রয়োজন চারটি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'সরকার যদি এখনই একটি নতুন এফএসআরইউ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, তাও সেটি চালু হতে ২৪ থেকে ৩০ মাস সময় লাগবে। ফলে পরিস্থিতি আসলেই সংকটজনক এবং সুব্যবস্থাপনা ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো সুযোগ নেই।'
বিইআরসি প্রধান বলেন, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের মতো ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দেন তিনি।
সৌরশক্তিকে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নবায়নযোগ্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করে এবং বায়ু ও জলবিদ্যুতের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে দিনে গড়ে মাত্র ৩.১ থেকে ৩.৯ ঘণ্টা কার্যকর সূর্যালোক পাওয়া যায়। তাই বৃহৎ পরিসরে সৌরশক্তি ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি স্টোরেজ বা বিদ্যুৎ ধরে রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু এই ব্যাটারি স্টোরেজ এখনো অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এতে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন। তাই একক কোনো জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি বেসলোড বিদ্যুৎ ও স্টোরেজের সুষম সমন্বয় প্রয়োজন।'
দেশের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সমালোচনা করে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, 'বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৩০,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এই অতিরিক্ত সক্ষমতার কারণে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'ক্যাপাসিটি চার্জ নিজে থেকে কোনো খারাপ বিষয় নয়। যেখানেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়, সেখানেই এটি থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো যখন বিশেষ আইনের অধীনে অস্বচ্ছ ও ব্যক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা হয়।' তিনি ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি চালুর পরামর্শ দেন।
জালাল আহমেদ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাক খাতের রপ্তানি সক্ষমতার সরাসরি যোগসূত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশের বাজার, সেখানে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে তৈরি পোশাক শিল্পকে পর্যায়ক্রমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের দিকে যেতে হবে।
তিনি জানান, বড় শিল্পগুলো ইতিমধ্যে তাদের ছাদে সোলার প্যানেল বসাচ্ছে। তবে ছোট কারখানাগুলোর জন্য কম খরচে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম খরচের ঋণ তহবিল আরও শক্তিশালী করা উচিত, যাতে শিল্পগুলো মাত্র ৫ শতাংশ সুদে সৌরশক্তিতে বিনিয়োগের জন্য ঋণ পেতে পারে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, এই জ্বালানি সংকটের রাতারাতি কোনো সমাধান সম্ভব নয়। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে একসঙ্গে নজর দিতে হবে। ১৯৯৬ সালের পর কয়লা নীতি নিয়ে মতবিরোধের কারণে নতুন কোনো জ্বালানি নীতি তৈরি না হওয়াকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব চাই, তবে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নীতি প্রয়োজন।'
