শেফিল্ডে হামজার স্থায়ী প্রত্যাবর্তন: ফিফা আসিয়ান কাপের আগে স্বস্তি লাল-সবুজ শিবিরে
চলতি মাসের শেষ দিকে জাকার্তায় প্রথমবারের মতো ফিফা আসিয়ান কাপের মঞ্চে নামছে বাংলাদেশ। ঐতিহাসিক এই মিশনের আগে লাল-সবুজের দর্শকদের মনে সবচেয়ে বড় কৌতূহল ও আশার নাম–হামজা চৌধুরী। তবে প্রশ্নটা এখন তার সামর্থ নিয়ে নয়, বরং ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের জন্য কতটা কার্যকর 'নম্বর ৬' হিসেবে গড়ে তুলবে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়।
গত ৩১ আগস্ট লেস্টার সিটি থেকে ধারে শেফিল্ড ইউনাইটেডে যোগ দিয়েই নিজের জাত চিনিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। ১ সেপ্টেম্বর বোল্টন ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে শেফিল্ডের ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ে পুরো ৯০ মিনিট মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।
পরিসংখ্যান বলছে, ম্যাচে তার পাসের নির্ভুলতা ছিল ৯০ শতাংশ (৫০টি পাসের ৪৫টিই সফল)। এছাড়া চারটি ট্যাকলের চারটিতেই সফল হয়ে নিজের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা প্রমাণ করেছেন তিনি।
আসিয়ান কাপের কঠিন সমীকরণ
র্যাঙ্কিংয়ের বিচারে আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের জন্য প্রতিটি ম্যাচই হবে এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। 'এ' গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া (১৩৬), সিঙ্গাপুর (১৪৮) এবং স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া (১১৮)। যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৮১তম।
সূচি অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া, ২৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর এবং ১ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে লড়বে থমাস ডুলির শিষ্যরা। শক্তিশালী এই প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে বাংলাদেশ কতটা বলের দখল ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। ঠিক এই জায়গাতেই হামজার ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে নির্ণায়ক।
কেন হামজা 'স্পেশাল'?
হামজার বিশেষত্ব গোল করা বা করানোতে নয়, বরং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ নস্যাৎ করে দেওয়াতে। গত মৌসুমে লেস্টার সিটির হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে ১,৪৯৪ মিনিট খেলার অভিজ্ঞতা তার ঝুলিতে রয়েছে। ট্যাকেল, ইন্টারসেপশন এবং বল পুনরুদ্ধারে তিনি অনন্য।
সেন্টার-ব্যাকদের সামনে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দেয়াল হয়ে দাঁড়ানো এবং বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত সতীর্থদের কাছে নিরাপদ পাস পৌঁছে দেওয়া তার খেলার মূল বৈশিষ্ট্য। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দলগুলোর গতির ফুটবল রুখতে হামজার এই রক্ষণাত্মক ফুটবল জ্ঞান বাংলাদেশের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে।
হামজার খেলার অন্যতম দিক হলো তার প্রবল আগ্রাসন। তবে এই আগ্রাসন কখনো কখনো বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। গত মৌসুমে লেস্টারের হয়ে ৩০ ম্যাচে তিনি সাতটি হলুদ কার্ড দেখেছেন। আসিয়ান কাপের মতো টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কার্ড দেখে মাঠ ছাড়া বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এছাড়া গত মৌসুমে কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট না থাকাটা মাঝমাঠের সৃজনশীলতায় তার সীমাবদ্ধতাকে নির্দেশ করে। তবে এতে তার ভূমিকা আরও স্পষ্ট–তিনি আক্রমণভাগের জন্য নয়, বরং রক্ষণের বর্ম হিসেবেই বেশি কার্যকর।
শেফিল্ডের পজিশনিং ও ম্যাচ ফিটনেস
শেফিল্ড ইউনাইটেড কোচ ক্রিস ওয়াইল্ডারের অধীনে হামজা কেবল মিডফিল্ডার হিসেবেই নন, রাইট-ব্যাক হিসেবেও খেলার ইঙ্গিত পেয়েছেন। বাংলাদেশের জন্য অবশ্য তার পজিশনের চেয়েও 'ম্যাচ শার্পনেস' বা প্রতিযোগিতামূলক খেলার ছন্দ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্বল্প সময়ের প্রস্তুতি ক্যাম্পে যে ধার তৈরি করা কঠিন, নিয়মিত ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে সেই তীক্ষ্ণতা নিয়েই জাকার্তায় নামবেন হামজা। শেফিল্ডে যদি তিনি নিয়মিত খেলার সুযোগ পান, তবে সেই আত্মবিশ্বাস বাংলাদেশের মাঝমাঠকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, শেফিল্ডে হামজার এই নতুন যাত্রা কেবল একটি ক্লাব বদল নয়, বরং আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। এখন দেখার বিষয়, ইংলিশ ফুটবলের ব্যস্ত সূচি সামলে কতটা ফিট ও ফর্মে থেকে তিনি লাল-সবুজের জার্সিতে মাঠ মাতাতে পারেন। জাকার্তার উত্তাপে হামজার বুটেই হয়তো লেখা হবে বাংলাদেশের নতুন ফুটবল উপাখ্যান।
