বেতন বাড়াবে না, কিন্তু কর্মঘণ্টা বাড়িয়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা করার দাবি জার্মানির শিল্প খাতের
চার দশক আগে জার্মানির ধাতু শিল্পের শ্রমিকরা দেশটির যুদ্ধোত্তর ইতিহাসের অন্যতম তিক্ত শ্রম লড়াইয়ে জয়ী হয়ে সপ্তাহে ৩৫ ঘণ্টা কাজের অধিকার অর্জন করেন। দেশের বৃহত্তম কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান কাজের সময় বাড়ানোর এ বিতর্ককে আবার নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
মার্সিডিজ-বেঞ্জ এবং স্টিল-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা অতিরিক্ত বেতন ছাড়াই কর্মীদের সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করার আহ্বান জানান। তাদের যুক্তি, অতিরিক্ত শ্রম ব্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
এই গ্রীষ্মের শুরুর দিকে জার্মান সংবাদপত্র হ্যান্ডেলসব্লাট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্সিডিজ-বেঞ্জ গ্রুপ এজি-র পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মার্টিন ব্রুডারমুলার বলেন, 'আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এখানে শ্রম এখন অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন যে, দেশ তার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উৎপাদনশীলতার সুবিধা হারিয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'সাপ্তাহিক কাজের সময় আবার ৪০ ঘণ্টায় ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি আমাদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।'
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে জার্মানিতে শ্রমের খরচ অন্যতম সর্বোচ্চ। দেশটির উৎপাদন খাতে প্রতি এক ঘণ্টা কাজের খরচ ৪৯.৫০ ইউরো, যা ইইউ-এর গড় খরচ ৩৩.৭০ ইউরোর চেয়ে ৪৭ শতাংশ বেশি এবং হাঙ্গেরির (১৫.৬০ ইউরো) তুলনায় তিনগুণ। জার্মানির ইউনিয়ন দ্বারা পরিচালিত গবেষণা সংস্থা 'আইএমকে'-এর এক জরিপ অনুযায়ী, পূর্ব ইউরোপের শ্রমিকদের তুলনায় জার্মান কর্মীরা বেশি উৎপাদনশীল হলেও, ২০২৩ সাল থেকে শ্রমিকদের মোট উৎপাদন ক্ষমতার বিপরীতে শ্রমের ব্যয় আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্পভিত্তিক ট্রেড ইউনিয়নগুলো অক্টোবর মাসে তাদের আগামী বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নতুন আলোচনা শুরু করতে যাওয়ার মুখেই ৪০ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহে ফিরে যাওয়ার দাবি তোলা হয়েছে। ১৯৮৪ সালের এক ঐতিহাসিক শ্রম আন্দোলনের পর টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়। তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির হাজার হাজার ধাতু শিল্প শোধনাগারের শ্রমিক কাজের সময় কমানোর দাবিতে টানা সাত সপ্তাহের ধর্মঘট পালন করেছিলেন।
বর্তমানে জার্মানির মোট কর্মীদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের জন্য যৌথ চুক্তির ভিত্তিতে এই ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ বহাল রয়েছে, যা প্রধানত অটোমোবাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং, লোহা ও ইস্পাত শিল্পের মতো খাতগুলোতে সীমাবদ্ধ। তবে সব খাত মিলিয়ে দেশটিতে গড়ে সাপ্তাহিক কাজের সময় ৩৭.৮ ঘণ্টা।
জার্মানির কর্মীরা অন্যান্য ওইসিডি অর্থনীতিভুক্ত দেশের তুলনায় বছরে গড়ে সবচেয়ে কম সময় কাজ করেন, যদিও খণ্ডকালীন কর্মসংস্থানের উচ্চ হারের কারণেই এমনটি পরিলক্ষিত হয়। কয়েক দশকের পুরোনো এই বিতর্ককে একটি জরুরি প্রতিযোগিতামূলক আলোচনায় রূপান্তর করেছে জার্মান উৎপাদন খাতের তীব্র সংকট।
২০১৭ সালের শেষদিকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর পর থেকে জার্মানির শিল্প উৎপাদন ১৫ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানির দামের ক্রমাগত ধাক্কা, চীনের ক্রমবর্ধমান তীব্র প্রতিযোগিতা, মার্কিন শুল্ক নীতি এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে আকস্মিক রূপান্তরের ধাক্কায় উৎপাদনকারীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রোল্যান্ড বার্জারের বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচারক মার্কাস বেরেটের মতে, উচ্চ শ্রম ব্যয় একসময় জার্মানির অন্যান্য আকর্ষণীয় সুবিধা—যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী অবকাঠামো, দক্ষ কর্মী এবং সমৃদ্ধ শিল্প কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়া যেত।
কিন্তু পূর্ব ইউরোপ ও তার বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে ব্যয়ের ব্যবধান যতটা বেড়েছে, জার্মানির সেই সুবিধাগুলো ঠিক ততটাই হ্রাস পেয়েছে। তিনি বলেন, 'শ্রম খরচের কথা বললে, আমরা কিন্তু ১০ বা ২০ শতাংশের ব্যবধান নিয়ে কথা বলছি না। কিছু ক্ষেত্রে এই খরচের পার্থক্য তিন থেকে চার গুণেরও বেশি।' এখনও পর্যন্ত জার্মানির উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বেশ ধীর গতিতে হ্রাস পেয়েছে। যার ফলে উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ এই খাতে নিয়োজিত।
তবে বেরেট মনে করেন সামনে আরও বেশি কর্মী ছাঁটাই হবে। তিনি বলেন, 'বিভিন্ন পৃথক কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমি ধারণা করছি যে, শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খাতে নিযুক্ত কর্মীর সংখ্যা ৫০ লাখের নিচে নেমে আসবে।' বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজারটি উৎপাদন খাতের চাকরি বিলুপ্ত হচ্ছে। এমনকি ভক্সওয়াগনের মতো বড় বড় নিয়োগকর্তারাও ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছেন, জার্মানিতে আরও বহু পদ ছাঁটাই করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যেসব কর্মী তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবেন, তাদের জন্য কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়তো অনিবার্য হয়ে উঠবে। জার্মান কাউন্সিল অব ইকোনমিক এক্সপার্টস-এর সদস্য মার্টিন ভার্ডিং বলেছেন, উচ্চ শ্রম ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য কারখানার মালিকেরা আগে যে কৌশলগুলো ব্যবহার করতেন—যেমন মন্দার সময় সাময়িক বা অস্থায়ী কর্মীদের ছাঁটাই করা—তা এখন আর যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, 'বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো এতটাই বড় যে শুধু এই নমনীয়তা বা কৌশল দিয়ে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।' অতিরিক্ত বেতন ছাড়াই কাজের সময় ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টায় উন্নীত করলে সাপ্তাহিক মজুরি খরচ অপরিবর্তিত থাকবে, কিন্তু কাজের সময় বেড়ে যাবে ১৪ শতাংশ। ভার্ডিং যোগ করেন, কাজের সময় নিয়ে এই বিতর্কটি 'শুধুমাত্র কোনো প্রতীকী রাজনীতি নয়, তারচেয়েও অনেক বেশি কিছু।' কারখানাগুলো একটি কঠোর ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ দ্বারা সীমাবদ্ধ—এই ধারণাটি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ২২ লাখেরও বেশি সদস্য বিশিষ্ট জার্মানির বৃহত্তম ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন 'আইজি মেটাল'।
আইজি মেটালের যৌথ দরকষাকষি বিষয়ক নির্বাহী এবং মার্সিডিজের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নাদিন বোগুস্লাভস্কি বলেছেন, মালিকদের সাথে বিদ্যমান চুক্তিগুলো ইতোমধ্যেই কোম্পানিগুলোকে কাজের সময় বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট নমনীয়তা দেয়। বোগুস্লাভস্কি বলেন, 'অনেক সময় যেভাবে একটি কঠোর ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের চিত্র তুলে ধরা হয়, আমার পরিচিত কোম্পানিগুলোতে বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।' তিনি আরও জানান, সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর জন্য তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সমাধানের পথ খুঁজতেও আইজি মেটাল প্রস্তুত।
এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ইউনিয়ন এবং মালিকপক্ষের মধ্যে একটি মৌলিক মতবিরোধ। বিতর্কটি হলো—কাজের সময় বাড়ানো হলে তা কি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজ কম সংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে উল্টো চাকরি কমাবে, নাকি জার্মান কারখানাগুলোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলে বিদ্যমান চাকরিগুলো রক্ষা করবে?
বোগুস্লাভস্কির মতে, ১৯৮০-এর দশকে 'আইজি মেটাল' ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহের জন্য কঠোর সংগ্রাম করেছিল তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কাজগুলো বেশি মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে আরও অধিক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, 'আপনি যদি সেই নিয়ম উল্টে দিয়ে কাজের সময় সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টায় উন্নীত করেন—সেই অতিরিক্ত ঘণ্টাগুলোর জন্য বেতন দেওয়া হোক বা না হোক—তবে আপনার স্বভাবতই কম শ্রমিকের প্রয়োজন হবে।'
তবে ভার্ডিংয়ের মতো অর্থনীতিবিদরা পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন, বাজারে কাজের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ আগে থেকে নির্ধারিত থাকে না। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর। তাদের মতে, প্রতি একক পণ্যে শ্রমের খরচ কম হলে তা যদি জার্মান কারখানাগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্তিশালী করে তোলে, তবে কোম্পানিগুলো তাদের উৎপাদন ও চাকরি দেশেই ধরে রাখতে পারবে, যা অন্যথায় বিদেশে স্থানান্তরিত হতো বা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যেত।
ইউনিয়ন ও মালিকপক্ষের দরকষাকষির ফলে কাজের সময় বাড়ানোর এই প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত স্থান পাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ধাতু শিল্পের মালিকদের সমিতি 'জিসামমেটাল' ৩৫ ঘণ্টার কর্মসপ্তাহ বাতিলের এই দাবির বিষয়ে অভ্যন্তরীণ বিবেচনা-র কথা উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এদিকে রোল্যান্ড বার্জারের প্রধান বেরেট আশঙ্কা করছেন যে, জার্মান শিল্প খাত যে গভীর সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, দেশের রাজনৈতিক ও জনপরিবেশের আলোচনা এখনো সেই বাস্তবতার সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি বলেন, 'আমাদের দিকে যে সংকট এগিয়ে আসছে, তার ভয়াবহতা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে বহু মানুষ এখনো একটি অলীক বাস্তবতায় বসবাস করছেন।'
