জলবায়ু পরিবর্তনে তীব্র গরমের ঝুঁকিতে মালয়েশিয়ার তরুণরা; বাড়ছে ত্বকের সমস্যা, তাপজনিত অসুস্থতা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হওয়ায় মালয়েশিয়ার তরুণদের মধ্যে বাড়ছে নানা রোগের প্রকোপ, তাপজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় ব্যাঘাত। এতে প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে দেশটির জলবায়ু অভিযোজন নীতিগুলো কতটা কার্যকর হবে?
ইউনিসেফ মালয়েশিয়ার 'ন্যাশনাল ইয়ুথ ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভে ২০২৫' চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয়। জরিপে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্যও তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৫ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ১ হাজার ৪২০ জন তরুণের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে জরিপটি করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি ঘন ঘন তাপপ্রবাহ, বন্যা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতেও নীতিনির্ধারকদের বিনিয়োগ করতে হবে। তা না হলে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় আরও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ কর্মশক্তিও।
ইউনিসেফ বলেছে, জরিপের ফলাফল দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন তরুণদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজনের বেশি বলেছেন, তাদের আগে থেকেই থাকা বিভিন্ন রোগের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এ ছাড়া ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ ত্বকের সমস্যা, ১৮ শতাংশ তাপজনিত অসুস্থতা এবং ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার কথা জানিয়েছেন।
অর্ধেকেরও বেশি তরুণ জানিয়েছেন, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ তাদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগে প্রভাব ফেলেছে। এসব সেবার মধ্যে রয়েছে তথ্য, শিক্ষা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ।
সানওয়ে সেন্টার ফর প্ল্যানেটারি হেলথের নির্বাহী পরিচালক ডা. জেমিলাহ মাহমুদ বলেন, ইউনিসেফের জরিপের ফলাফল দেখিয়েছে, বিষয়টি এখন আর শুধু পরিবেশগত উদ্বেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, 'জলবায়ু ও স্বাস্থ্যের ওপর এর সরাসরি প্রভাব আমরা ইতোমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি সরাসরি আঘাত, সংক্রামক রোগ, দীর্ঘমেয়াদি রোগের অবনতি এবং মানসিক চাপ সবকিছু একই সময়ে ঘটছে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী এমন একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে; যে বয়সে তাদের সবচেয়ে সুস্থ থাকার কথা।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিপের ফলাফল মালয়েশিয়ায় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরেছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোকে দেশের ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির জন্য একটি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
মালয়েশিয়াভিত্তিক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল স্টাডিজের জলবায়ুবিষয়ক উপদেষ্টা রেনার্ড সিউ বলেন, 'এখন আর এটি দুটির একটিকে বেছে নেওয়ার বিষয় নয়। মালয়েশিয়াকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।'
সিউ জানিয়েছেন, শিশু ও তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে। তবে এখনো অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ সব খাতেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু না করার খরচ অভিযোজনের খরচের চেয়ে অনেক বেশি হবে। ঘন ঘন তাপজনিত চাপ, রোগের প্রাদুর্ভাব ও জলবায়ুজনিত নানা ব্যাঘাত উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলবে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বাড়াবে এবং সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর করবে।
তিনি বলেন, 'সময়ের সঙ্গে এসব আমাদের কর্মশক্তির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা দুর্বল করে দেবে।'
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রচণ্ড তাপের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোট শিশুরা অন্যতম। কারণ, তাদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কম সক্ষম। ফলে তারা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে।
কুয়ালালামপুরভিত্তিক বেসরকারি চিকিৎসক ডা. ভেনু গোপালান 'দিস উইক ইন এশিয়া'কে বলেন, 'এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিশুদের শরীরের তাপ মোকাবিলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। তারা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে আনার প্রক্রিয়াও সহজেই চাপে পড়ে যায়।'
তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরমের তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পেশিতে টান, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিট এক্সহসশন বা তাপজনিত অবসাদ এবং হিটস্ট্রোক। এমনকি হিটস্ট্রোক মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
গোপালান সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বারবার প্রচণ্ড গরমের মধ্যে থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের রোগ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পানিশূন্যতা ও শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার কারণে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সিউ বলেন, মালয়েশিয়ার জলবায়ু মোকাবিলার বড় পরিকল্পনা থাকলেও জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত এখনো অনেকটা আলাদাভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, 'স্কুলে জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে মূল্যায়ন চালু করতে হবে। তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা, বায়ুর মান নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।'
চলতি বছর মালয়েশিয়ায় একাধিকবার তীব্র গরমের সতর্কতা জারি করেছে দেশটির আবহাওয়া বিভাগ। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত উত্তরাঞ্চল ও সাবাহর কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে।
সোমবার আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেলান্তানের কুয়ালা ক্রাইয়ে দেশের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এরপর ছিল পাহাংয়ের তেমেরলোহ, ৩৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি।
এই গরমে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত অসুস্থতার ৭৩টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ছিল ৫৯টি তাপজনিত অবসাদ, ছয়টি পরিশ্রমজনিত হিটস্ট্রোক, চারটি হিটস্ট্রোক, প্রসবের পর অতিরিক্ত জ্বরের দুটি ঘটনা এবং হিট ক্র্যাম্পের দুটি ঘটনা।
এ সময়ে তাপজনিত কারণে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক ও দুজন শিশু; যাদের বয়স ২ ও ৪ বছর।
অগ্রগতি আছে, রয়েছে ঘাটতিও
৩১ জুলাই বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে বলেছে, এল নিনোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এটি বিশ্বের আবহাওয়ার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এতে অনেক এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।
ডা. গোপালান বলেন, তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার বর্তমান জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। শুধু সতর্কতা জারি করলেই হবে না, বিশেষ করে যারা দীর্ঘ সময় গরমে কাজ বা অবস্থান করতে বাধ্য হন; যেমন: খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক, গৃহহীন মানুষ ও শিক্ষার্থীরা।
তিনি বলেন, 'তাপজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণগুলো সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে হবে, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শুধু রোদ এড়িয়ে চলতে বললে বড় একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা বাস্তবসম্মত হবে না।'
জেমিলাহ বলেন, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তাপপ্রবাহ মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং জলবায়ু আইন এগিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে মালয়েশিয়া। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।
তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের জলবায়ু পরিকল্পনাকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকারের কাজের সঙ্গে সমন্বয় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত তরুণদের অর্ধেকের বেশি অন্তত একটি জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
জেমিলাহ বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তুতি এখনো পিছিয়ে।'
সিউ বলেন, এই ঘাটতি মালয়েশিয়ার জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাকে তুলে ধরে। চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি একই হলেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ নিয়ে নীতিগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, জলবায়ু অভিযোজনের দায়িত্ব শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
সিউ বলেন, 'আমরা জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কারণ শিশু ও তরুণরাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে। আজ জলবায়ু সহনশীলতায় বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতের মানবসম্পদে বিনিয়োগ।'
