স্পেনে দুর্ঘটনায় গাজীপুরের তরুণের মৃত্যু, দিশাহারা পরিবার
আর্থিক স্বচ্ছলতা ও পরিবারের দেনা মেটাতে ইউরোপের দেশ স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের তরুণ ইউসুফ হাসান আলিফ (২৭)। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সেখানে এগিয়ে যাচ্ছিলেন স্বপ্ন পূরণের পথে। দুদিন আগে পেয়েছিলেন কাঙ্ক্ষিত কাজের অনুমতিও (ওয়ার্ক পারমিট)। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মাদ্রিদের একটি বাইসাইকেল গ্যারেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি।
গত রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় স্পেনের মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার বৈদ্যুতিক বাইসাইকেলের গ্যারেজে ব্যাটারি থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারা যান ইউসুফ।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, স্পেনে ইউসুফ ফুড ডেলিভারির কাজ করতেন। যেই সাইকেল দিয়ে ডেলিভারির কাজ করতেন, সেই সাইকেল নিতেই ওই গ্যারেজে গিয়েছিলেন তিনি। ওই সময় গ্যারেজে থাকা একটি বৈদ্যুতিক বাইসাইকেলের ব্যাটারি বিস্ফোরিত হয়ে পুরো গ্যারেজে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আটকে পড়ে ইউসুফ তার সহকর্মীদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে শেষ বার্তা পাঠান- 'আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে'। পরে সেখানেই বিষাক্ত গ্যাস ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ইউসুফ।
গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুনের ছেলে ইউসুফ। দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
গত বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্পেনের নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে কাজের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ও বৈধতা পেয়েছিলেন ইউসুফ। যেদিন তিনি মারা যান, সেদিন বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার দিকে মা-বাবার সঙ্গে ফোনে শেষবার কথা হয় তার।
ছেলের মৃত্যুতে পাথর হয়ে গেছেন মা রহিমা খাতুন। সোমবার বিকেলে বাড়ির আঙ্গিনায় বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, "গতরাত ১১টায় আমার ছেলে ফোন করে বলেছে, দুই দিন আগে বৈধ হয়ে কাজ পেয়েছে। আমার সব দেনা পরিশোধ করে আগামী ঈদ আমাদের সঙ্গে করবে। আর আজ সকালে শুনলাম, আমার ছেলে মারা গেছে। তোমরা আমার মানিকরে এনে দাও।''
ইউসুফের বাবা আব্দুল মোতালেব জানান, রবিবার রাতে কথা বলার সময় ইউসুফ আগামী ঈদ পরিবারের সঙ্গে দেশে কাটানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইউসুফ জানায়, তার আর আধ ঘণ্টার ডিউটি বাকি আছে, কাজ শেষ করে আবার ফোন করবে। কিন্তু সেই ফোন আর আসেনি। পরদিন সকালে আসে মৃত্যুর খবর আসে।
ইউসুফের বাবা আরও জানান, সাড়ে ১১ মাস আগে ২৯ লাখ টাকা খরচ করে ইউসুফকে স্পেনে পাঠানো হয়েছিল। এই অর্থের পুরোটাই নেওয়া হয়েছিল স্থানীয় বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ হিসেবে, যার বিপরীতে প্রতি মাসে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। একদিকে ছেলে হারানোর শোক, অন্যদিকে বিপুল অর্থের ঋণের বোঝায় পরিবারটি এখন দিশাহারা।
এদিকে ইউসুফের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়েও বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। আব্দুল মোতালেব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "এখন শুনছি ছেলের লাশ দেশে আনতে ১৪-১৫ লাখ টাকা লাগবে। সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই।''
জানতে চাইলে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি কামরুল ইসলাম বলেন, "আলিফের লাশ দেশে আনার বিষয়ে সরকারি যাবতীয় সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত। পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে আইন অনুযায়ী সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
