বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে স্বতন্ত্র কমিশন: একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর প্রস্তাব
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে বন অধিদপ্তর ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একটি প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর রয়েছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও নীতি প্রণয়ন, বৈজ্ঞানিক পরামর্শ, ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন—এসব দায়িত্বের মধ্যে যথেষ্ট আন্তঃসম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক 'ওভারল্যাপ' রয়েছে। এর ফলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার একটি বন্যপ্রাণী কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগকে কেবল বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আরও একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী শাসনব্যবস্থাকে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আমি মনে করি যে, প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশন' হবে একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান দায়িত্ব হবে দেশের বন্যপ্রাণী ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা, পুনরুদ্ধার এবং টেকসই ব্যবহারের জন্য জাতীয় নীতি, কৌশল, মানদণ্ড ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কমিশন নিজে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হবে না; বরং নীতি নির্ধারণ, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং সরকারের কাছে প্রমাণভিত্তিক সুপারিশ প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় বন্যপ্রাণী শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ নীতিগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।
১. বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এখন কেবল বন রক্ষা বা কয়েকটি অভয়ারণ্য পরিচালনার বিষয় নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস, বনভূমির খণ্ডীকরণ, অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত, নগরায়ণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নদী ও জলাভূমির পরিবর্তন এবং সমুদ্র উপকূলের পরিবেশগত চাপ—সবকিছু মিলিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ একটি জাতীয় নীতি ও উন্নয়ন-পরিকল্পনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই বাস্তবতায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা—
- ১.১. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে দীর্ঘমেয়াদি বন্যপ্রাণী নীতি প্রণয়ন করবে;
- ১.২. সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করবে;
- ১.৩. বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করবে;
- ১.৪. বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কার্যক্রম মূল্যায়ন করবে;
- ১.৫. স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, সংরক্ষণ সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করবে;
- ১.৬. জাতীয় পর্যায়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে; এবং
- ১.৭. সরকারের কাছে সুস্পষ্ট, প্রমাণভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সুপারিশ প্রদান করবে।
২. কমিশনের মূল দর্শন
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শন হবে:
"নীতি প্রণয়ন স্বাধীন, সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিক, বাস্তবায়ন পেশাদার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত।"
এখানে চারটি দায়িত্বকে পৃথক করা হবে—
- ২.১. কমিশন - নীতি নির্ধারণ ও তদারকি
- কমিশন নির্ধারণ করবে কী করা প্রয়োজন এবং কেন করা প্রয়োজন।
- ২.২. বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা বোর্ড - কারিগরি ও অংশীজনভিত্তিক পরামর্শ
- উপদেষ্টা বোর্ড নির্ধারণে সহায়তা করবে কীভাবে সেই নীতি বাস্তবায়ন করা যায়।
- ২.৩. বন্যপ্রাণী উইং/বন অধিদপ্তর - বাস্তবায়ন
- বাস্তবায়নকারী সংস্থা মাঠপর্যায়ে কাজটি করবে।
- ২.৪. কমিশন - স্বাধীন মূল্যায়ন
কমিশন পুনরায় মূল্যায়ন করবে কাজটি সঠিকভাবে হয়েছে কি না। এই দায়িত্ব বিভাজনের মাধ্যমে নীতি প্রণয়নকারী এবং বাস্তবায়নকারী একই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
৩. কমিশনের সাংগঠনিক অবস্থান
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশন হবে একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কমিশন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নীতিগতভাবে সমন্বয় করবে; কিন্তু কমিশনের দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, গবেষণা, প্রতিবেদন ও সুপারিশে মন্ত্রণালয় বা বন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।
কমিশন সরকারের বিকল্প সরকার হবে না এবং বন অধিদপ্তরের বিকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানও হবে না।
এর ভূমিকা হবে—
সরকারকে নীতি প্রদান → বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে নীতিগত কাঠামো প্রদান → বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ → সরকার ও জাতীয় সংসদকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
৪. কমিশনের গঠন
প্রস্তাবিত কমিশন হবে ৯ সদস্যবিশিষ্ট (প্রয়োজনে এ সংখ্যা বৃদ্ধি করা যেতে পারে)।
প্রস্তাবিত সদস্য সংগঠন:
- ১. চেয়ারম্যান: অবসরপ্রাপ্ত একজন মাননীয় বিচারপতি বা স্বনামধন্য ও অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণী/জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ।
- ২. সদস্য: বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞান ও বাস্তুবিদ্যা বিশেষজ্ঞ।
- ৩. সদস্য: সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান ও প্রজাতি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।
- ৪. সদস্য: বন ও ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।
- ৫. সদস্য: পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী আইন বিশেষজ্ঞ।
- ৬. সদস্য: স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সামাজিক-পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
- ৭. সদস্য: পরিবেশ অর্থনীতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।
- ৮. সদস্য: জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-তথ্য ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ।
- ৯. সদস্য: জনপ্রশাসন, নীতি গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি।
বন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা প্রয়োজন অনুযায়ী কমিশনের সভায় আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে অংশ নিতে পারবেন; তবে কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য সরকারি প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তা হওয়া উচিত নয়।
৫. কমিশনার নিয়োগ ও স্বাধীনতা
কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিয়োগব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি কোনো মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ করা উচিত নয়। এর পরিবর্তে একটি 'বন্যপ্রাণী কমিশন নিয়োগ বাছাই কমিটি' গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটিতে বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, বন্যপ্রাণী বিজ্ঞান, পরিবেশ আইন এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
কমিশনারদের মেয়াদ হবে ৫ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কোনো কমিশনারকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কারণে ইচ্ছামতো অপসারণ করা যাবে না। গুরুতর অসদাচরণ, দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা, স্বার্থের সংঘাত বা আইনে নির্ধারিত অন্য কোনো কারণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অপসারণ করা যাবে। এ ধরনের ব্যবস্থা ছাড়া 'স্বাধীন কমিশন' নামটি বাস্তবে অর্থবহ হবে না।
৬. কমিশনের প্রধান দায়িত্ব ও ক্ষমতা
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের দায়িত্বকে নিম্নোক্ত প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা যেতে পারে:
৬.১ জাতীয় বন্যপ্রাণী নীতি প্রণয়ন
কমিশন দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করবে। নীতিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—
প্রজাতি সংরক্ষণ; আবাসস্থল সংরক্ষণ; বন্যপ্রাণী করিডোর; সংরক্ষিত এলাকা; অন্যান্য কার্যকর এলাকা-ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা; জলাভূমি ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য; বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ; অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্য; মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ; জলবায়ু পরিবর্তন; বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন; গবেষণা ও তথ্যব্যবস্থা।
৬.২ জাতীয় বন্যপ্রাণী কৌশল
নীতির ভিত্তিতে কমিশন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কৌশল প্রণয়ন করবে। এই কৌশলে আগামী ১০-২০ বছরে কোন প্রজাতি, কোন আবাসস্থল এবং কোন ভূদৃশ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হবে।
৬.৩ বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা যেন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে, সে জন্য কমিশন বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ করবে। যেমন—কোনো প্রজাতিকে বিপন্ন হিসেবে বিবেচনার মানদণ্ড; গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল নির্ধারণ; বন্যপ্রাণী করিডোর নির্ধারণ; সংরক্ষিত এলাকা মূল্যায়ন; OECM নির্ধারণ; প্রজাতির পুনঃপ্রবর্তন; বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন; মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত ব্যবস্থাপনা।
৭. বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা বোর্ডের নতুন ভূমিকা
প্রস্তাবিত কাঠামোয় বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা বোর্ড বিলুপ্ত করার প্রয়োজন নেই। বরং এর ভূমিকা আরও স্পষ্ট ও কার্যকর করা প্রয়োজন। কমিশন জাতীয় নীতি নির্ধারণ করবে, আর উপদেষ্টা বোর্ড হবে সেই নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বহুপক্ষীয় কারিগরি ও অংশীজনভিত্তিক পরামর্শ কাঠামো।
বোর্ডে থাকতে পারেন—বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ; বন অধিদপ্তর; বন্যপ্রাণী উইং; মৎস্য অধিদপ্তর; কৃষি বিভাগ; ভূমি মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার; বিশ্ববিদ্যালয়; গবেষণা প্রতিষ্ঠান; স্থানীয় জনগোষ্ঠী; আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি; সংরক্ষণ সংস্থা; প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য অংশীজন।
মূল পার্থক্য:
কমিশন বলবে: কী নীতি প্রয়োজন? উপদেষ্টা বোর্ড বলবে: এই নীতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়? বাস্তবায়নকারী সংস্থা বলবে: আমরা মাঠে তা বাস্তবায়ন করব।
৮. বন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী উইংয়ের ভূমিকা
বন অধিদপ্তর বা বন্যপ্রাণী উইংকে কমিশনের অধীনস্থ প্রশাসনিক সংস্থা বানানোর প্রয়োজন নেই। তাদের প্রধান দায়িত্ব থাকবে—
সংরক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা; মাঠপর্যায়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ; টহল ও নজরদারি; বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন; উদ্ধার ও পুনর্বাসন; আবাসস্থল ব্যবস্থাপনা; স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ; কমিশনের অনুমোদিত জাতীয় নীতি ও মানদণ্ড বাস্তবায়ন।
অর্থাৎ বন অধিদপ্তর হবে প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা, কিন্তু জাতীয় বন্যপ্রাণী নীতির একমাত্র নির্ধারক হবে না।
৯. কমিশনের স্বাধীন সচিবালয়
কমিশনের নিজস্ব একটি 'বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশন সচিবালয়' থাকতে হবে। সচিবালয়ে থাকতে পারেন—
বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী; বাস্তুবিদ; সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ; পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ; অর্থনীতিবিদ; সমাজবিজ্ঞানী; ভূ-তথ্য ও দূর অনুধাবন বিশেষজ্ঞ; তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষক; নীতি গবেষক; যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।
সচিবালয় যদি পুরোপুরি বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা দিয়ে পরিচালিত হয়, তাহলে কমিশনের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
১০. কমিশনের অর্থায়ন
কমিশনের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দ থাকা উচিত। এর অর্থায়ন হতে পারে—জাতীয় বাজেট; সরকারি বরাদ্দ; আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ তহবিল; গবেষণা অনুদান; বৈধ সংরক্ষণমূলক অনুদান; করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল এবং জাতীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ তহবিল।
তবে কোনো দাতা বা অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান কমিশনের নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
১১. সরকারের সঙ্গে কমিশনের সম্পর্ক
কমিশন সরকারের কাছ থেকে স্বাধীন হলেও সরকারের প্রতিপক্ষ হবে না। কমিশনের সুপারিশ সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তবে কোনো ক্ষেত্রে সরকার কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ না করলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের কারণ লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা তৈরি হবে:
কমিশন সুপারিশ করবে → সরকার সিদ্ধান্ত নেবে → ভিন্ন সিদ্ধান্ত হলে সরকার কারণ ব্যাখ্যা করবে।
১২. জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি
প্রতি বছর কমিশন একটি 'বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর অবস্থা: বার্ষিক প্রতিবেদন' প্রকাশ করবে। প্রতিবেদনে থাকবে—গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির অবস্থা; আবাসস্থলের পরিবর্তন; সংরক্ষিত এলাকার কার্যকারিতা; বন্যপ্রাণী অপরাধ; মানব-বন্যপ্রাণী সংঘাত; সংরক্ষণ ব্যয়ের চিত্র; নীতির বাস্তবায়ন অগ্রগতি; গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা; ভবিষ্যৎ করণীয়।
প্রতিবেদনটি সরকার ছাড়াও জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির কাছে উপস্থাপন করা উচিত।
১৩. উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশনের ভূমিকা
বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প—সড়ক, রেলপথ, শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎ প্রকল্প, বন্দর বা অন্যান্য স্থাপনা—অনেক সময় বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও চলাচলের পথকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত:
বন্যপ্রাণী প্রভাব মূল্যায়ন
কোনো প্রকল্প যদি গুরুত্বপূর্ণ—হাতির করিডোর; বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল; প্রজননক্ষেত্র; জলাভূমি; অভিবাসনপথ।
সংরক্ষিত এলাকা
প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রাখে, কমিশন সেই প্রকল্পের বন্যপ্রাণী-সংক্রান্ত প্রভাব মূল্যায়ন চাইতে পারবে।
১৪. OECM ও নতুন ধরনের সংরক্ষণ ব্যবস্থা
বাংলাদেশের সব গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য শুধু প্রচলিত সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে অবস্থিত নয়। অনেক বন, জলাভূমি, কমিউনিটি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল বা অন্যান্য ভূদৃশ্য বাস্তবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কমিশন তাই—অন্যান্য কার্যকর এলাকা-ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা (OECM) সম্পর্কে জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে প্রচলিত 'সংরক্ষিত বন' ধারণার বাইরে গিয়ে বৃহত্তর সংরক্ষণ ভূদৃশ্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
১৫. কমিশনের কার্যক্রমের একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা কমছে এবং মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ছে। প্রথম ধাপ- কমিশন: বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে কমিশন জাতীয় হাতি সংরক্ষণ নীতি প্রণয়ন করবে।
দ্বিতীয় ধাপ - উপদেষ্টা বোর্ড: বোর্ড নীতির ভিত্তিতে তৈরি করবে—
হাতির করিডোর ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা; সংঘাত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি; স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের কাঠামো; ক্ষতিপূরণ ও প্রতিরোধব্যবস্থা; স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
তৃতীয় ধাপ - বাস্তবায়নকারী সংস্থা: বন্যপ্রাণী উইং ও বন অধিদপ্তর মাঠপর্যায়ে এসব বাস্তবায়ন করবে।
চতুর্থ ধাপ - কমিশনের মূল্যায়ন: এক বছর পর কমিশন মূল্যায়ন করবে— নীতির ফলে হাতির আবাসস্থল ও করিডোর কতটা সুরক্ষিত হয়েছে? সংঘাত কমেছে কি? স্থানীয় মানুষের ক্ষতি কমেছে কি? সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়েছে কি?
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কমিশন নীতি সংশোধনের সুপারিশ করবে। এভাবেই একটি নীতি → বাস্তবায়ন → মূল্যায়ন → সংশোধন চক্র প্রতিষ্ঠিত হবে।
১৬. প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
বাংলাদেশ সরকার→বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশন→বন্যপ্রাণী উপদেষ্টা বোর্ড→ বন্যপ্রাণী উইং/বন অধিদপ্তর→ সরকার ও জাতীয় সংসদ
১৭. উপসংহার
বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য যদি কেবল বিদ্যমান বন প্রশাসনের মধ্যে আরও একটি ছোট প্রশাসনিক ইউনিট সৃষ্টি করা হয়, তাহলে এই কমিশনের সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। কিন্তু কমিশনকে যদি একটি স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক, নীতিনির্ধারণী ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী শাসনব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের মূল শক্তি হবে তার স্বাধীনতা, বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি নীতিচিন্তা এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা। সুতরাং প্রস্তাবিত কাঠামোর মূলনীতি হওয়া উচিত—বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশন নীতি নির্ধারণ করবে, উপদেষ্টা বোর্ড নীতিকে বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামোয় রূপ দেবে, বন অধিদপ্তর ও বন্যপ্রাণী উইং তা বাস্তবায়ন করবে, আর কমিশন স্বাধীনভাবে সেই বাস্তবায়নের ফলাফল মূল্যায়ন করবে।
এই দায়িত্ব-বিভাজনই বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে প্রচলিত বন বিভাগ-কেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে একটি আধুনিক 'জাতীয় বন্যপ্রাণী শাসনব্যবস্থায়' রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী কমিশনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষা নয়; বরং এমন একটি জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা—যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন, মানুষের স্বার্থ এবং বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব এই তিনটি বিষয় বৈজ্ঞানিক ও ন্যায়সংগতভাবে সমন্বিত হয়।
লেখক: বন্যপ্রাণী, চিড়িয়াখানা এবং সাফারি পার্ক বিশেষজ্ঞ
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
