কোথাও ট্যাকটাইলস নেই, কোথাও আবার বাধাগ্রস্ত: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কতটা নিরাপদ ঢাকার ফুটপাত?
সাদা ছড়ি হাতে ঢাকা কলেজ থেকে নিউমার্কেটের দিকে হাঁটছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান রাহুল।
পথ চেনার জন্য সেখানে কোনো ট্যাকটাইল পেভিং ছিল না। ভাঙাচোরা ফুটপাতে পানি জমে থাকায় নিচের খোলা অংশটিও বুঝতে পারেননি তিনি। হঠাৎ পা আটকে ছিঁড়ে যায় জুতা, পায়েও কেটে যায়। দুর্ঘটনাটি বড় না হলেও রাজধানীর ফুটপাত যে তার মতো মানুষের জন্য কতটা অনিরাপদ, সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হন রাহুল।
শুধু ট্যাকটাইল পেভিং না থাকাই সমস্যা নয়। রাজধানীর অনেক ফুটপাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পথ চিনতে সহায়তা করার জন্য বসানো হলুদ ট্যাকটাইল টাইলসের ওপরই রয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি ও নানা স্থাপনা। এসব প্রতিবন্ধকতা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সব পথচারীর চলাচল কঠিন করে তুলছে।
ঢাকা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী রাহুল বলেন, "রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট আমাদের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। বিশেষ করে ঢাকা কলেজ ও নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাতগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও কোনো ট্যাকটাইল পেভিং নেই, আবার অধিকাংশ ফুটপাতই ভাঙাচোরা ও উঁচুনিচু। কয়েকবার এসব ভাঙা ফুটপাতে আমার জুতা ছিঁড়ে গেছে, পায়ে আঘাতও পেয়েছি।"
তিনি বলেন, "একদিন ঢাকা কলেজ থেকে নিউমার্কেটে যাওয়ার সময় কলেজ গেটের সামনের ভাঙা ফুটপাতে পা আটকে জুতা ছিঁড়ে যায় এবং পায়ে কেটে যায়। জায়গাটিতে পানি জমে ছিল, আবার অনেকে সেখানে মূত্রত্যাগ করায় পরিবেশও ছিল নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। সৌভাগ্যক্রমে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি।"
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকা কলেজের স্নাতকোত্তরের আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, "২০১৮ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই এই এলাকার ফুটপাতগুলো ভাঙাচোরা দেখছি। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে সাদা ছড়ি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই আঘাতের মুখে পড়তে হয়।"
নিজের একটি দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরে রাজ্জাক বলেন, "একবার আজিমপুর এলাকায় যাওয়ার সময় ফুটপাত না থাকায় বা ভাঙা থাকার কারণে সাদা ছড়ি দিয়ে বুঝতে না পেরে আমি সরাসরি একটি ড্রেনে পড়ে যাই। তখন বৃষ্টির পানি জমে থাকায় পুরো শরীর ভিজে যায়।"
সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আছেন প্রায় পাঁচ লাখ।
অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩৪ ধারায় গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
অনেক ফুটপাতেই নেই ট্যাকটাইলস, কোথাও আবার ভাঙাচোরা
রাজধানীর শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেত, কাঁটাবন, সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেট, মিরপুর-১০, মহাখালী, বনানী ও গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও ট্যাকটাইলস নেই, কোথাও সেগুলো ভাঙা। আবার কোথাও ট্যাকটাইলসের মাঝেই রয়েছে খুঁটি, ম্যানহোল, লোহার ব্যারিয়ার কিংবা হকারদের দোকান।
শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নীলক্ষেত এলাকায় ট্যাকটাইলস থাকলেও শাহবাগ থেকে কাঁটাবন হয়ে সায়েন্সল্যাব পর্যন্ত প্রধান সড়কের ফুটপাতে ট্যাকটাইলসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব ফুটপাতের বেশির ভাগই চায়ের দোকান, খাবারের স্টল ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের দখলে।
মেট্রোরেলকে কেন্দ্র করে ফার্মগেট থেকে মিরপুর-১০ পর্যন্ত কিছু এলাকায় নতুন ট্যাকটাইলস বসানো হয়েছে। তবে পুরোনো সড়কগুলোতে এমন সুবিধা খুব একটা দেখা যায় না।
ফার্মগেট এলাকায় মোটরসাইকেল ফুটপাতে ওঠা ঠেকাতে ট্যাকটাইলসের মাঝ বরাবর লোহার পিলার বসানো হয়েছে। মহাখালী রেলগেট থেকে বিজয় সরণির দিকে এসকে টাওয়ারের বিপরীত পাশের পুরো ফুটপাতজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন খাবারের দোকান ও অস্থায়ী ব্যবসা।
মহাখালী থেকে বনানী ও গুলশান এলাকায় ট্যাকটাইলস থাকলেও অনেক জায়গায় এর মাঝ বরাবর বিদ্যুতের খুঁটি, ল্যাম্পপোস্ট, ম্যানহোল কিংবা উঁচুনিচু ঢালাই রয়েছে। কোথাও কোথাও টাইলস ভেঙে গেছে বা খুলে গেছে।
ট্যাকটাইলস কী, জানেন না অনেকেই
শুধু অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাই নয়, ট্যাকটাইলস সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাবও চোখে পড়েছে।
তেজগাঁওয়ে ট্যাকটাইলসের ওপর দিয়ে হাঁটছিলেন এক পথচারী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "কখনো খেয়াল করিনি এটা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য। আজ জানলাম। মাঝখানে দোকান বসলে তারা চলবে কীভাবে?"
আগারগাঁওয়ের চাকরিজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, "ট্যাকটাইলস সম্পর্কে জানি। কিন্তু অনেক সময় দেখি হঠাৎ করেই ট্যাকটাইলস শেষ হয়ে যায়। ফুটপাত থেকে নামার জায়গাটাও ঠিকভাবে করা নেই।"
তিনি বলেন, "সাধারণ মানুষেরই হাঁটার পথে এত বাধা। উন্নয়ন যদি হয়, সেটা যেন সবার জন্য হয়।"
গুলশান-১ এলাকায় রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, "আগে কখনো ভাবিনি এই নকশা করা ইটের কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। এখন বুঝলাম, এটা কারও পথ চিনতে সাহায্য করে।"
আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই
ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে ফুটপাতে এই বিশেষ টাইলস বসানোর উদ্যোগ নেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। পরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) একই ধরনের টাইলস বসানো শুরু করে। এখনও এ কার্যক্রম চলমান।
২০১৩ সালে 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন' পাস হওয়ার পর গণস্থাপনায় সহজ প্রবেশযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সেই লক্ষ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ট্যাকটাইলস বসানো শুরু হয়। তবে পরিকল্পনার ঘাটতি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও দখলদারিত্বের কারণে অনেক জায়গায় এগুলো এখন কেবল প্রতীকী অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
অন্ধ শিক্ষা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করা বিইআরডিওর (ব্লাইন্ড এডুকেশন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন) নির্বাহী পরিচালক মো. সাইদুল হক টিবিএসকে বলেন, নগর পরিকল্পনা ও সংস্কারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চলাচলের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, "ফুটপাতের পাশে খোলা ম্যানহোল, অসমান ড্রেন, র্যাম্পের পরিবর্তে উঁচু ধাপ এবং মোটরসাইকেল ঠেকাতে বসানো লোহার ব্যারিয়ার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য নিয়মিত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।"
তিনি আরও বলেন, "শুধু ট্যাকটাইল টাইলস বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফুটপাতে হকার, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, ময়লা-আবর্জনা ও পশুপাখির বর্জ্য জমে থাকে। ফলে ট্যাকটাইল পথও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই প্রতিবন্ধীবান্ধব নগর নিশ্চিত করতে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।"
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, "একজন সুস্থ মানুষই এই শহরে চলতে হিমশিম খান। তাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ঢাকার বর্তমান অবকাঠামো কতটা উপযোগী, তা সহজেই বোঝা যায়। ট্যাকটাইলস বসানো হলেও অনেক জায়গায় তা মাঝপথে শেষ হয়ে গেছে, দখল বা নানা প্রতিবন্ধকতায় কার্যকারিতা হারিয়েছে। শুধু ট্যাকটাইলস বসালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেগুলো বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে র্যাম্প, সহজলভ্য গণপরিবহন ও সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সব নাগরিকের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল সার্কেল) ফারুক হাসান মো. আল মাসুদ বলেন, সব ফুটপাতে একই ধরনের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয় না। টাইলস দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং একই ধরনের টাইলস দিয়ে মেরামত কঠিন হওয়ায় সব জায়গায় ট্যাকটাইল স্ট্রিপ বসানো সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, হকার, দখলদারিত্ব, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও তদারকির ঘাটতির পাশাপাশি নাগরিকদের অসচেতনতাও ফুটপাত কার্যকর রাখার ক্ষেত্রে বড় বাধা।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, নীতিগতভাবে ভবন, বাসস্ট্যান্ড ও ফুটপাতে প্রতিবন্ধীবান্ধব র্যাম্প রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তবে ঢাকার অধিকাংশ ফুটপাত প্রয়োজনের তুলনায় সংকীর্ণ। এর সঙ্গে হকারদের দখল, ভাঙা টাইলসের রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং তাৎক্ষণিক মেরামতের সীমাবদ্ধতার কারণে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, "বড় বাজেটের কথা বলা হলেও বাস্তবে বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া যায়। সেই অর্থের বড় অংশই বেতন-ভাতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দাপ্তরিক ব্যয়ে চলে যায়। ফলে উন্নয়নকাজের জন্য সীমিত অর্থ অবশিষ্ট থাকে, যা প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।"
