পাঁচ বছরের রোডম্যাপের মাধ্যমে বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি পেমেন্টে বছরে ১.৮ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের লক্ষ্য সরকারের
সঠিক নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ খাতের বার্ষিক ১.৫ থেকে ১.৮ বিলিয়ন ডলার ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের 'ফাইভ-ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জুলাই ২০২৬–জুন ২০৩১)-এ।
এ ফ্রেমওয়ার্কে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, গ্যাস সংকট, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং এ খাতে ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
এই পরিকল্পনা দলিলে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে। তবে আগামী পাঁচ বছরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ১৫ শতাংশ রিজার্ভ মার্জিন বিবেচনায় মোট চাহিদা দাঁড়াতে পারে প্রায় ২৫ হাজার ৭১৪ মেগাওয়াট। তবু পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যমান সক্ষমতা এই চাহিদার চেয়ে বেশি থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশীয় জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে এই ফ্রেমওয়ার্কে অনশোর ও অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত শুরু করার সুপারিশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ভৌগোলিক ঝুঁকি কমাতে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণের সুপারিশও করা হয়েছে এতে।
ভোলার গ্যাস মজুতের সদ্ব্যবহারের জন্য প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এছাড়া ভেদুরিয়া-ইলিশা এলাকা থেকে খুলনা অঞ্চলে দৈনিক ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে সিলেট থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত গ্যাস পরিবহন সংকট দূর করাও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ এই সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে কম দক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করতে হচ্ছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা দলিলের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় এই দলিল অনুমোদন করে সরকার।
কয়লা, পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও গ্রিড সম্প্রসারণ
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ফ্রেমওয়ার্কে চারটি নতুন কয়লাখনি উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন জোরদারের প্রস্তাব করা রয়েছে।
মাতারবাড়ী ও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পাশাপাশি মহেশখালীতে বিপিডিবির অধিগ্রহণকৃত ৫ হাজার একর জমিতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এই পরিকল্পনায়।
উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বড় ধরনের সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এতে।
এতে ৭৬৫ কেভি ডাবল-সার্কিট সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্রিড শক্তিশালী করার এবং নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে লোড-ফ্লো স্টাডি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া টেকসই বেজলোড উৎপাদন নিশ্চিটের জন্য রোডম্যাপে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা
এই ফ্রেমওয়ার্কে স্বল্পতম সময়ে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে অন-গ্রিড ও রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ উভয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তবে গ্রিডের স্থিতিশীলতা বিবেচনায় বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ৩–৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎকে অগ্রাধিকার দিয়ে অফিস, শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনে ব্যাটারি ব্যাকআপসহ সৌর স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে এ পরিকল্পনায়।
এতে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আমদানিতে কর ছাড় ও রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে পাঁচ বছরের কর অবকাশ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
ট্যারিফ ও ভর্তুকি সংস্কার
বিদ্যুতের ট্যারিফের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়কে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার এবং রিয়েল-টাইম ভিত্তিতে সমন্বয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এই ফ্রেমওয়ার্কে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঋণ সংকট মোকাবিলায় আর্থিক পুনর্গঠন ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
চাহিদা ব্যবস্থাপনায় রাত ১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত অটোরিকশা চার্জিং স্থানান্তর ও অতিরিক্ত এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের সময় ভিন্ন ট্যারিফ আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে এ প্রস্তাবে। এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারকারীদের জন্য সরকারি ভর্তুকি বন্ধের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে ফ্রেমওয়ার্কটিতে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৩–৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ ও পেট্রোবাংলার মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
সৌর বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় পৃথক সৌরভিত্তিক গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণা দেওয়া হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের ঝুঁকি
ফ্রেমওয়ার্কটিতে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণকে টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান উপায় হিসেবে দেখা হলেও, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এ খাতে তড়িঘড়ি অগ্রগতি নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এতে আরও বলা হয়েছে, অনেক দেশ সমন্বিত পরিকল্পনা, সময়মতো সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ গ্রিড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সফলভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করেছে। তবে পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালে তা উল্টো বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নয়নের চেয়ে দ্রুত হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও তা গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এতে গ্রিডে জট তৈরি হয়েছে এবং উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের একটি অংশ বাধ্য হয়ে কমিয়ে দিতে হয়েছে।
এ পরিকল্পনা দলিলে আরও বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ে। চাহিদা পরিকল্পনার ঘাটতি এবং গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে অদক্ষতা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপও বাড়ে, কারণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পথে এগোয়, তবে সমান্তরালভাবে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং চাহিদা ব্যবস্থাপনার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়া ব্যাটারি স্টোরেজ, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ও সমন্বিত জ্বালানি পরিকল্পনা ছাড়া বৃহৎ পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংযোজন করলে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
