দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সংবিধান ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
এ নিয়োগকে সংবিধান ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক রিদওয়ানুল হক।
নিজের ফেসবুক পোস্টে সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'সুপ্রিম কোর্টের সাবেক একজন বিচারপতিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া অসাংবিধানিক পদক্ষেপ, এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সরাসরি লঙ্ঘন।'
রিদওয়ানুল হক তার বক্তব্যের পক্ষে সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেন। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত বা অপসারিত কোনো বিচারপতি বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় পদ ছাড়া 'প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে' অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না।
গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও এ নিয়োগের সমালোচনা করেন রিদওয়ানুল হক। তিনি বলেন, সরকার 'স্পষ্টতই গণতন্ত্রের বিপরীত পথে হাঁটছে'।
তিনি উল্লেখ করেন, কয়েক বছর আগেও একই ধরনের একটি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ এ ধরনের নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও এর সাংবিধানিক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতেও সরকারের এ নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সম্ভাব্য সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে এবং দুদকের কার্যক্রম নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার ২০০৪ সালের একটি 'খারাপ নজির'-এর পুনরাবৃত্তি করেছে। সে সময়ও একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এ নিয়োগ সংবিধানের ৯৯(১) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে থাকতে পারেন না।
তিনি বলেন, "দুদক কোনো বিচারিক বা আধা-বিচারিক সংস্থা নয়।"
তিনি আরও বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা কোনো আদালতে আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত হয়ে মামলা পরিচালনাও করতে পারেন না।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "ফলে এ নিয়োগ দুই দিক থেকেই সমস্যা তৈরি করেছে।"
তিনি বলেন, "একদিকে দুদক বিচার বিভাগীয় বা আধা-বিচার বিভাগীয় সংস্থা নয়। অন্যদিকে এটি একটি তদন্তকারী সংস্থা। সেখানে একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে দুদক পরিচালিত হলে শুধু স্বার্থের সংঘাতই তৈরি হবে না, বরং যত দিন একজন সাবেক বিচারপতি এর নেতৃত্বে থাকবেন, তত দিন কার্যত প্রতিদিনই সংবিধান লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠবে।"
তিনি বলেন, এ নিয়োগ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নিজের জন্যও নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি হিসেবে তার কাছ থেকে যে মূল্যবোধ ও সততা প্রত্যাশিত, দুদকের চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ ও সেই দায়িত্ব পালন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেই প্রশ্নও উঠছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "সরকার যদি এসব সাংবিধানিক ও নৈতিক প্রশ্ন উপেক্ষা করে যায়, তাহলে বড় প্রশ্নটি হবে সম্মানিত বিচারপতির নিজের নৈতিক অবস্থান নিয়ে। আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি হিসেবে যে মূল্যবোধ ও সততা তার ধারণ করার কথা, এই পদ গ্রহণ ও দায়িত্ব পালন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই বিবেচনার বিষয়।"
আইন বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত
এদিকে অন্য আইন বিশেষজ্ঞরা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, দুদক কোনো আধা-বিচারিক সংস্থা নয়। এটি দুদক আইনের অধীনে গঠিত একটি সংবিধিবদ্ধ তদন্ত সংস্থা। দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত এবং মামলা করার উদ্যোগ নেওয়াই সংস্থাটির দায়িত্ব। অন্যদিকে, মামলার বিচার ও রায় দেওয়ার কাজ করে বিশেষ জজ আদালতসহ বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
গত ১৭ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৬(১) ধারা অনুযায়ী গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ নিয়োগের কথা জানায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
আসাদুজ্জামানের পাশাপাশি ড. জাহাঙ্গীর আলম ও ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়াকে দুদকের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমপর্যায়ের বেতন, ভাতা ও মর্যাদা পাবেন। অন্যদিকে, দুই কমিশনার হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমপর্যায়ের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
গত ২২ জুন গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশে রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়োগ দেন।
এ নিয়োগের মধ্য দিয়ে কয়েক মাস পর দুদকে আবার স্থায়ী নেতৃত্ব ফিরল। আগের কমিশন গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করার পর থেকে সংস্থাটি স্থায়ী কমিশন ছাড়াই চলছিল।
নতুন কমিশন দীর্ঘদিন ধরে চলমান তদন্তগুলোর গতি বাড়ানোর পাশাপাশি দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কয়েক মাস স্থায়ী শীর্ষ নেতৃত্ব ছাড়া চলা সংস্থাটির দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কমিশনের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতাও নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে বিশেষজ্ঞদের।
