৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: সাবেক রাষ্ট্রপতি ও এস আলমের বিরুদ্ধে দুদকে ইসলামী ব্যাংকের অভিযোগ
বেনামী প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতি ও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমসহ ৩৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার ফার্স্ট এসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ইয়াসীন আলী দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এই অভিযোগপত্রটি জমা দেন।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, যার ফলে ব্যাংকটি বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়েছে।
ঋণ জালিয়াতির নেপথ্যে
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এই জালিয়াতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল 'সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড' নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এটি মূলত একটি রুগ্ণ ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল, যার প্রাথমিক বিনিয়োগ সীমা ছিল মাত্র ১০০ কোটি টাকা। তবে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অভিযুক্তদের রাজনৈতিক প্রভাব ও সরাসরি সহায়তায় যথাযথ যাচাই-বাছাই ও পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই এই ঋণের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়। প্রথমে এটি ২০০ কোটি এবং পরবর্তীতে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।
তথ্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ২০ জুন থেকে ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাহী বোর্ডের সভায় এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়। ঋণ পরিশোধে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক দফায় তাগাদাপত্র ও চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হলেও ঋণগ্রহীতারা কোনো অর্থ পরিশোধ করেননি।
অভিযুক্তদের তালিকায় যারা
ইসলামী ব্যাংকের এই অভিযোগে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে সুপ্রভ কম্পোজিট নিট লিমিটেড এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস ওরফে আলহাজ্ব মো. ইউনুস বাদলের। এছাড়া তালিকায় রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড, প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এ বি এম শামসুল হাসান, সালেহা শাহিন ও উম্মে সালমা শারমিন।
উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে এসেছে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল আলম (মাসুদ) ওরফে এস আলমের নাম, যাকে ঋণের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া তালিকায় ইসলামী ব্যাংকের সাবেক একাধিক পরিচালক, নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও, সাবেক ডিএমডিসহ বেশ কয়েকজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১, ৪৭৭(এ), ৩৪ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(১)(২) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ কর্পোরেট শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এস আলমের ঋণ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যাংকের একাধিক মামলা রয়েছে। আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে একটি মামলার তথ্য সরবরাহের অংশ হিসেবে আমরা দুদকে এই ঋণ অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য জমা দিয়েছি।'
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, 'আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন কোনো অভিযোগ এখনও হাতে পাইনি। বর্তমানে আমাদের কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। কমিশন পুনর্গঠিত হওয়ার পর এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।'
