সরকারের প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র চলছে: জামায়াত
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমকে 'ব্যর্থতা ও দুর্বলতায়' ভরা আখ্যা দিয়ে সরকারের প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন না করা, প্রশাসনে দলীয়করণ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমের ওপর দলের মূল্যায়ন তুলে ধরতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, 'ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের বড় বড় আমলা, সচিবরা এখন প্রমোশন পাচ্ছেন, বিভিন্ন জায়গায় নিয়োগ পাচ্ছেন। বর্তমান সরকারের প্রশ্রয়ে সব জায়গায় আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছেন।' তিনি আরও বলেন, 'গত ১৫ আগস্ট সরকারি প্রশ্রয়ে তারা আগের বছরের চেয়ে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টসহ বিভিন্ন জায়গায় যেভাবে বিচরণ করেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে একদলীয় শাসন এবং আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের একটা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।'
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করাকে সরকারের বড় ব্যর্থতা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি জুলাই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের কথা বললেও ক্ষমতায় এসে এ বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও সেই কাঠামো কার্যকর হয়নি। জামায়াতের অভিযোগ, জুলাই সনদের প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদ সীমিতকরণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকারসহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও বাস্তবায়ন হয়নি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, 'বিভিন্ন সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম ১১০ দিনেই ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর পাশাপাশি ডাকাতি, অপহরণ, চুরি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে।'
শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত ও হামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর রক্তপাত হবে না—এমন প্রত্যাশা থাকলেও আলিয়া মাদরাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকাশ্যে ছাত্রদল ও বিএনপিকে সহযোগিতা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে 'কৌশলগত দুর্বলতার' অভিযোগ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' ঘোষণাকে এখনো একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলেও দাবি করেন তিনি। এছাড়া সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত দিয়ে ব্যাপক হারে 'পুশ ইন' শুরু হলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়েও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদার তুলনায় প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। এতে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে এবং বিএনপি-মনোভাবাপন্ন নন এমন সৎ কর্মকর্তাদের বদলি ও ডিমোশন দেওয়া হচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকলেও এর পেছনে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই বলে দাবি করেন তিনি। তবে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় সেটিকে সাধুবাদ জানিয়েছে জামায়াত।
সংবাদ সম্মেলন থেকে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রদান, জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এবং গুম প্রতিরোধ আইনে সংস্কারসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
