বন্ধ ৩ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা সরকারের
ঢাকার ডেমরায় বন্ধ থাকা লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস লিমিটেড ও করিম জুট মিলসের জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একইভাবে কুষ্টিয়া সুগার মিলসের জমিতেও অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কর্মকর্তারা জানান, দেশের অব্যবহৃত শিল্পসম্পদকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি, নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আগস্টে বেজা গভর্নিং বোর্ডের সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের জমি বেজার কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগ কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানান, বিনিয়োগবান্ধব শিল্প পরিবেশ তৈরি করতে প্রস্তাবিত অঞ্চলগুলোতে অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে।
বেজা কর্মকর্তারা বলেন, বন্ধ কারখানার জমি নতুন করে উৎপাদন ও বিনিয়োগের কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে (ইপিজেড) সফল উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডেমরায় ১৩৩ একর জমি
ক্রমাগত লোকসানের কারণে ডেমরার লতিফ বাওয়ানী এবং করিম জুট মিল ২০০০ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। কারখানা দুটি যথাক্রমে ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭২ সালে এগুলোকে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে আনা হয়।
করিম জুট মিলসের প্রায় ৫০ একর ও লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের প্রায় ৮৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ দুই কারখানার ১৩৩ একর জমি নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সরকার আশা করছে, প্রস্তাবিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা শিল্পের জমি উৎপাদন ও বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হবে।
কুষ্টিয়া সুগার মিলসের ২২০ একর জমি
কুষ্টিয়া সুগার মিলসের ২২০ একর জমিতেও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
১৯৬৫-৬৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া সুগার মিলস শুরুতে কয়েক বছর লাভে থাকলেও ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ২০২০ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
মিলটির শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকায় ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর মিলটি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার এই মিলের ২২০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
যোগাযোগ করা হলে বেজার নির্বাহী সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) সালেহ আহমেদ টিবিএসকে বলেন, 'জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন করা হবে, তা নিয়ে আমরা এখন কাজ করছি। এক্ষেত্রে আমরা আদমজী জুট মিলকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করছি।'
তিনি বলেন, তারা চান প্রক্রিয়াটি যেন আদমজীর মতোই হয়, যেখানে সরকার মিলের সব দায়দেনা মিটিয়ে এর জমি বেপজার কাছে হস্তান্তর করেছিল।
সালেহ আহমেদ আরও বলেন, 'সরকার এসব বন্ধ মিলের যাবতীয় বকেয়া দায়দেনা মেটানোর পর এগুলোর জমি হস্তান্তরের জন্য আমরা কাজ করছি।'
ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের আওতায় আসার সম্ভাবনা
কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পরিকল্পিত ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অধীনে আসতে পারে।
দেশের একক বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা হিসেবে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ' গঠনের লক্ষ্যে সম্প্রতি সংসদে 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬' পাশ হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে বেজা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বিলুপ্ত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ নামক একক সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে।
এই আইনে শিল্পাঞ্চল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তর গ্রহণ ও প্রদানের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর আওতায় সরকার গভর্নিং বোর্ডের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা শিল্প এলাকা পারস্পরিক সম্মতির শর্তে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যস্ত করতে পারবে।
একইভাবে কর্তৃপক্ষের কোনো শিল্পাঞ্চল বা সেখানে স্থাপিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার কাছে উন্নয়ন, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য হস্তান্তর করা যাবে।
ফলে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো ভবিষ্যতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত বিনিয়োগ উন্নয়ন কাঠামোর আওতায় পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান বেজার কর্মকর্তারা।
আদমজী ইপিজেড উদাহরণ
অব্যবহৃত শিল্পের সম্পদগুলোকে কীভাবে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা যায়, আদমজী ইপিজেড তার একটি সফল উদাহরণ।
স্বাধীনতার পর আদমজী জুট মিল জাতীয়করণ করা হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ব্যবস্থাপনায় আসে। কিন্তু দীর্ঘদিনের আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মিলটি ক্রমশ সংকটে পড়ে। সরকারকে প্রতি বছর ক্রমাগত লোকসান গুনতে হয়।
লোকসান গোনার পর শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালের ৩০ জুন সরকার মিলটি বন্ধ করে দেয়।
নিষ্ক্রিয় জুট মিল এলাকায় বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা এবং মিলের জমি ও স্থাপনাকে উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প ব্যবহারে আনার লক্ষ্যে ২০০৪ সালের ১ ডিসেম্বর মিলের জমি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন করেন।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৯২.৬২ একর আয়তনের আদমজী ইপিজেডে ২৭৬টি শিল্প প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ইপিজেডে ৮৪৭.০৩ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। একই সময়ে এখান থেকে ১১.১৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
বর্তমানে এখানে ৭৬ হাজার ২৭ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক পণ্য, জুতা, সেফটি জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজারসহ উচ্চমূল্যের পোশাক এবং জাপানি গাড়ির সিট কাভারসহ বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিপণ্য উৎপাদিত হচ্ছে।
