ভারতের জন্য তালিকাচ্যুত মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবার গড়ে তুলবে চীনা প্রতিষ্ঠান
ভারতের জন্য ইতঃপূর্বে নির্ধারিত মোংলার একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমি এবার চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। সেখানে একটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ কৌশলে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, কারণ বাংলাদেশ এখন চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) বেইজিংয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান 'চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন' (সিসিইসিসি)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। যার আওতায়, বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের সংলগ্ন ১১০ একর জমির ওপর 'চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল' গড়ে তোলা হবে।
রাষ্ট্রীয় সফরে বর্তমানে চীনে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এক দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের আওতায় এই জমিটি আগে ভারতের অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে ভারত সরকারের মনোনীত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রকল্পটিকে তালিকাচ্যুত বা বাতিল করে।
গতি পাচ্ছে বিনিয়োগ উদ্যোগ
চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে সই হওয়া বেশ কয়েকটি বিনিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তির মধ্যে মোংলার এই চুক্তিটি অন্যতম।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় 'চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল' প্রতিষ্ঠার জন্য চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন (সিআরবিসি)-এর সঙ্গেও একটি ডেভেলপার সমঝোতা স্মারক সই ও বিনিময় করেছে বেজা।
এছাড়া বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের প্রসার, ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা সেবা নিশ্চিত করতে চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপআইটি)-এর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।
এর বাইরে ঢাকার কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিডার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পে কোম্পানিটি ২২ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
ভারত-সমর্থিত প্রকল্প যেভাবে চীনের কাছে
২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারত দুটি ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছিল—যার একটি মোংলায় এবং অন্যটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হওয়ার কথা ছিল। ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) কর্মসূচির আওতায় এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।
মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবং মোংলা বন্দরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য জোরদার করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, ভারতীয় অর্থায়নে মোংলা বন্দর ও খুলনার মধ্যে একটি নতুন রেলপথও নির্মাণ করেছিল দুই দেশ।
মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি উন্নয়নে ২০১৮ সালের ২১ মার্চ হিরানান্দানি গ্রুপকে ডেভেলপার হিসেবে মনোনয়ন দেয় ভারত সরকার। পরে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইভিটা কনস্ট্রাকশন্স প্রাইভেট লিমিটেড (ইসিপিএল)-কে ডেভেলপার নিয়োগ দিয়ে ২০২২ সালের ২ মার্চ একটি সমঝোতা স্মারক সই করে বেজা।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি অবাস্তবায়িতই থেকে যায়। বেজার কর্মকর্তাদের মতে, চুক্তিতে নির্ধারিত দুই বছরের মধ্যে ভারতীয় ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি ভূমি উন্নয়নের মূল কাজ শুরুই করতে পারেনি।
বেজার কর্মকর্তারা জানান, পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশে অবস্থিত চীনের দূতাবাস একই জায়গায় একটি চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় অর্থায়নের এই প্রকল্পটিকে তালিকাচ্যুত ঘোষণা করে।
ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা
বেজার নির্বাহী সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম জানান, মোংলা ইকোনমিক জোনে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী (হাই-ভ্যালু-অ্যাডেড) উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা।
টিবিএস'কে তিনি বলেন, "চীনা বিনিয়োগকারীরা মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা টেলিকমিউনিকেশন ও ইলেকট্রনিক্সসহ বিভিন্ন অগ্রগামী খাতে উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া আধুনিক ওয়্যারহাউজিং বা পণ্য মজুতকরণ সুবিধা গড়ে তুলতেও তাদের আগ্রহ রয়েছে।"
নজরুল ইসলাম আরও জানান, "সদ্য সই হওয়া এই চুক্তিটি এই পর্যায়ে কেবল সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) সমঝোতা হিসেবে কাজ করবে। এর পর চীনা পক্ষ বিস্তারিত পরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) প্রস্তুত করবে। এরপর আমরা টেকনিক্যাল ও নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করব এবং পরবর্তী চুক্তিগুলোর দিকে এগোব।"
তিনি বলেন, "এই প্রকল্পে বেজা নতুন করে বড় কোনো অর্থ বিনিয়োগ করতে চায় না। আমরা জমি দেব, আর ডেভেলপার অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্যান্য বিনিয়োগ করবে। জমির মূল্যের বিপরীতে প্রকল্পে বেজার অংশীদারিত্ব থাকবে কি-না, সেটি পরবর্তী আলোচনায় নির্ধারণ হবে।"
