যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার সঙ্গে সঙ্গেই রসদসংকটে পড়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আব্রাহাম লিংকন
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরিটির রসদসংকট যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই দেখা দিতে শুরু করে। সেদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও হামলাকারী ড্রোন বাহরাইনে থাকা মার্কিন নৌঘাঁটিতে আঘাত হানে।
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে চালানো ইরানের ওই হামলায় ঘাঁটির বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। ঘাঁটিটি আগুনে পুড়তে পুড়তে ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীও কয়েক দশক ধরে যে গুরুত্বপূর্ণ রসদ সরবরাহকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে আসছিল, সেটিও হারিয়ে যায়।
চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে যুদ্ধবিমানগুলোকে হামলা চালানোর উপযোগী রাখার পাশাপাশি পরে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত নাবিকদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে নৌবাহিনীকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়।
এই অঞ্চলের অন্যান্য বন্দরেও ইরানের হামলার আশঙ্কা থাকায় পেন্টাগন সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপের একটি ঘাঁটির দিকে নজর দেয়। দ্বীপটি মালদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত এবং ওমান উপসাগরে বর্তমানে যে দুটি বিমানবাহী রণতরি স্ট্রাইক গ্রুপ কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেখান থেকে এর দূরত্ব প্রায় দুই হাজার ২০০ মাইল।
বাহরাইনের ওই রসদকেন্দ্র হারানোর কারণে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনাকারী বিমানবাহী রণতরিগুলোতে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট সিনেটররা প্রায় নয় মাস ধরে মোতায়েনে থাকা লিংকনের ৫ হাজার নাবিকের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, যেসব সমস্যার কথা জানা গেছে তার মধ্যে রয়েছে মৌলিক প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি এবং জাহাজের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি।
শুক্রবার মেরিল্যান্ডের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে ট্রাম্প এসব উদ্বেগ উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, 'ওই জাহাজটি এখনই, অথবা খুব শিগগিরই, রওনা হচ্ছে এবং এর পরিবর্তে একই ধরনের আরেকটি জাহাজ পাঠানো হচ্ছে।'
লিংকনের পরিবর্তে যে রণতরিটি পাঠানো হচ্ছে সেটি হলো জাপানভিত্তিক ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। চলতি সপ্তাহের শুরুতে এটি ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় মালাক্কা প্রণালি দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পথে ছিল।
আরেকটি বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশও কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করছে। এটি গত ৩১ মার্চ নরফোক থেকে যাত্রা করে সেখানে মোতায়েন হয়।
বিমানবাহী রণতরিগুলোর মোতায়েনের মেয়াদ খুব দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে কি না—এমন প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট বলেন, 'না, না, না—কোনোভাবেই যথেষ্ট দীর্ঘ নয়।'
বৃহস্পতিবার এক সাংবাদিক যুক্তরাষ্ট্র কতদিন হরমুজ প্রণালির অবরোধ বজায় রাখতে পারবে জানতে চাইলে হেগসেথও একই ধরনের উত্তর দেন।
তিনি বলেন, 'যতদিন প্রয়োজন, ততদিন—অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত—আমরা এটি ধরে রাখতে পারি।'
যুদ্ধের শুরুতে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ব্যবহারের জন্য পেন্টাগনকে ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। ওই সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন। শেষ পর্যন্ত স্টারমার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ১ মার্চ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দ্বীপটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। তবে তিনি এটিকে 'নির্দিষ্ট ও সীমিত প্রতিরক্ষামূলক উদ্দেশ্যে' ব্যবহারের অনুমতি হিসেবে বর্ণনা করেন।
সংবেদনশীল রসদসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানান, বাহরাইনে নৌবাহিনীর ঘাঁটিটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরপরই নৌবাহিনী ডিয়েগো গার্সিয়াকে প্রধান পণ্য ও রসদ পাঠানোর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
নৌবাহিনীর নতুন রসদকেন্দ্র হিসেবে ডিয়েগো গার্সিয়াকে ব্যবহার করাই হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারে, কেন ২০ মার্চ ইরান ওই দ্বীপের দিকে দুটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।
এর একটি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যস্থলে পৌঁছানোর আগেই ভারত মহাসাগরে পড়ে যায়। অন্য ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি মার্কিন নৌযান গুলি করে ধ্বংস করে।
সান দিয়েগোভিত্তিক ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্রায় নয় মাস ধরে সমুদ্রে রয়েছে। এই সময়ে নৌবাহিনীর ভাষায় 'স্বাধীনতা বন্দর'—যেখানে নাবিকেরা কয়েক দিনের জন্য জাহাজ থেকে নেমে তীরে সময় কাটাতে পারেন—এমন কোনো বন্দরে জাহাজটি থামেনি।
এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলো সাধারণত যে দুটি বন্দরে নোঙর করে তাদের একটি হলো বাহরাইন। সেখানে নাবিকেরা কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পান। অন্যটি হলো উপসাগরীয় ওমান সাগরের তীরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর। তবে এটিও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যেই রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির অভিযানে ক্যারিবীয় অঞ্চলে অবস্থানরত আরেকটি বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের ওপরও নির্ভর করেছিল। পরে ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে এর মোতায়েনের মেয়াদ বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়।
এখন পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরিগুলোর বহরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মোতায়েন করা হয়েছে। আগামী বছর ইউএসএস নিমিটজ অবসর নেওয়ার পর এই বহরে রণতরির সংখ্যা কমে ১০টিতে দাঁড়াবে।
শান্তিকালে সাধারণত একটি বিমানবাহী রণতরির সমুদ্রে মোতায়েনের মেয়াদ ছয় মাস। তবে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর কয়েকটি বিমানবাহী রণতরি এর চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে সমুদ্রে ছিল।
তবে ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের ৩২৬ দিনের মোতায়েন ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর কোনো বিমানবাহী রণতরির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মোতায়েনের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ইয়াঙ্কি স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী বিমানবাহী রণতরিগুলো—ভিয়েতনামের উপকূলের অদূরে প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় যেটি ইয়াঙ্কি স্টেশন নামে পরিচিত ছিল—প্রায়ই ফিলিপাইনের সুবিক বে নৌঘাঁটির দিকে যেত।
সুবিক বে ছিল মাত্র দুই দিনের সমুদ্রযাত্রার দূরত্বে। সেখানে নাবিকেরা টানা বিমান পরিচালনার কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার সুযোগ পেতেন। একই সঙ্গে জাহাজগুলো সেখানে অস্ত্র, খাবার, জ্বালানি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করতে পারত।
নৌবাহিনীর প্রচলিত রীতি ও নিয়ম অনুযায়ী, কোনো যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা টানা ৪৫ দিন বা তার বেশি সময় সমুদ্রে থাকলে জাহাজটির কমান্ডিং কর্মকর্তা তাদের জন্য 'বিয়ার ডে' আয়োজনের অনুরোধ করতে পারেন।
লিংকনের সমুদ্রে অবস্থানের সময় বিবেচনায় এর নাবিকেরা ইতোমধ্যেই এ ধরনের পাঁচটি 'বিয়ার ডে'র জন্য যোগ্য হয়ে গেছেন।
এই অঞ্চলের নৌ অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের একজন মুখপাত্র, যারা 'বিয়ার ডে'র অনুমোদন দিয়ে থাকেন, শুক্রবার পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া কোনো জাহাজ এ ধরনের দিনের জন্য আবেদন করেছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে করা অনুরোধেরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেননি।
এক সাক্ষাৎকারে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মাইক লেভিন বলেন, তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে লিংকনে কর্মরত নাবিকও রয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদি এই মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
লেভিন বলেন, 'শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আবার সেই বড় প্রশ্নের কাছেই ফিরে আসে—এখানে আসলে মিশনটি কী? নাবিকদের পরিবারগুলো সেটিই জানতে চায়।'
