ইনফান্তিনোর ‘প্রেমিকাকে’ অর্থ দিয়েছিল, স্বীকার করল উয়েফা; সভাপতিকে ‘সরানোর’ চেষ্টার সমালোচনা ফিফার
ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো উয়েফার প্রধান থাকাকালে তার গোপন 'প্রেমিকাকে' মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অন্যদিকে তাকে পদ থেকে 'সরানোর চেষ্টা' করে সভাপতিকে এবং ফিফাকে দুর্বল ও অবমূল্যায়ন করার প্রচেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।
উয়েফায় দায়িত্ব পালনকালে ওই সাবেক নারী কর্মীকে ছয় অঙ্কের অর্থ (কয়েক লাখ পাউন্ড) প্রদান ও ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ওঠা গোপন প্রেমের অভিযোগের পর বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এমন অবস্থান নিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত উয়েফার জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইনফান্তিনো এক নারী কর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। পরে ওই নারীকে লাভজনক পদে পদোন্নতি ও সংস্থা ত্যাগ করার সময় মোটা অঙ্কের অর্থও দেওয়া হয়। এছাড়া তার উচ্চতর শিক্ষার (এমবিএ) যাবতীয় খরচও বহন করেছিল উয়েফা।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সিএনএনকে উয়েফা নিশ্চিত করেছে, ওই নারীকে স্থানীয় এক বিজনেস স্কুলে এমবিএ কোর্সের ফি-সহ বিদায়ী অর্থ দেওয়া হয়েছিল। উয়েফার দাবি, 'তৎকালীন বিদায়ী কর্মীদের জন্য কার্যকর নিয়মনীতি অনুযায়ীই তাকে অর্থ প্রদান করা হয়েছিল। তবে ২০১৬ সাল থেকে এ ধরনের নিয়মাবলী আরও কঠোর করা হয়েছে।'
টেলিগ্রাফকে ফিফার এক মুখপাত্র জানান, ইনফান্তিনো এসব 'মিথ্যা' অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফিফা আরও বলেছে, যেকোনো ধরনের অনুচিত আচরণ বা আইন লঙ্ঘনের সংকেত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মানহানিকর।
শনিবার এক বিবৃতিতে ফিফা বলেছে, 'ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, ফিফা ও এর সভাপতিকে দুর্বল করতে একটি গোষ্ঠী একযোগে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যারা ফিফার সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সমর্থন পায়নি, তাদের উচিত নয় অভিযোগ, ইঙ্গিত বা অপপ্রচারের মাধ্যমে এমন কিছু অর্জনের চেষ্টা করা, যা তারা ফিফার প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জন করতে পারেনি।'
এফএফই প্রস্তাব ও বয়কটের হুমকি
সাম্প্রতিক এ বিতর্কের আগেই বাতিল হয়ে যাওয়া ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে উয়েফা ও ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছ থেকে চাপের মুখে ছিলেন ইনফান্তিনো।
এফএফই প্রস্তাব পাশ হলে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার আংশিক বাণিজ্যিক ও টিকিট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হতো, যার ২১ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হতো একটি বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে।
উয়েফা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে, তারা ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারিয়েছে। অন্যদিকে নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের (এনএফএফ) সভাপতি লিস ক্লাভনেস এই কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। খেলোয়াড়দের সংগঠন ফিফপ্রো-ও জানিয়েছে, ফিফার নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।
উয়েফা হুমকি দিয়েছে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটার বিষয়ে নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি না পেলে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপের মতো ফিফার ইভেন্টগুলো তারা বয়কট করবে। এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বিশ্বকাপের গ্রহণযোগ্যতা চরম হুমকির মুখে পড়বে, কারণ পুরুষ ও নারী উভয় ফুটবলের বর্তমান শীর্ষ ১০ দলের ৬টিই ইউরোপের।
তবে ফিফা শনিবার বলেছে, 'ফিফা সভাপতি সংস্থাটির সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাদের ম্যান্ডেট নিয়েই তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পরিবর্তন অনিবার্যভাবেই প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তা ফিফা সভাপতির গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটকে দুর্বল করার চেষ্টাকে বৈধতা দেবে।'
বিশ্ব ফুটবলে বিভাজন
ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে এই বিরোধিতা মূলত ইউরোপ থেকে আসছে। তবে অন্যান্য মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর সমর্থন এখনও ইনফান্তিনোর পক্ষেই রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা 'কনমেবল' ও মেক্সিকান ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের ভোট ছাড়া ইনফান্তিনোকে অপসারণের যেকোনো চেষ্টা তারা প্রত্যাখ্যান করবে। তারা আগামী বছরের নির্ধারিত সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে।
তাছাড়া আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (ক্যাফ) ৫৪টি দেশও সর্বসম্মতভাবে ইনফান্তিনোকে সমর্থন জানিয়েছে।
মরক্কোর রাবাতে ফিফার পরিচালনা পর্ষদের এক বৈঠক ডাকেন ইনফান্তিনো। সেখানে ইনফান্তিনো ও সাধারণ সম্পাদক ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম এফএফই প্রস্তাবের জন্য ক্ষমা চান। আর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভাপতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফিফা তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে বিবৃতিতে বলেছে, 'ফিফা যৌক্তিক ও গঠনমূলক তদারকিকে স্বাগত জানায়। তবে তদারকি মানেই তথ্য বিকৃত করা, ভিত্তিহীন অভিযোগ হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া কিংবা অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার সুযোগ নেওয়া নয়। যেখানেই ভুল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন করা হবে, ফিফা সরাসরি এবং কঠোরভাবে তা চ্যালেঞ্জ করবে।'
