অনুমতি ছাড়াই গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের তেল অনুসন্ধানের প্রস্তুতি, সরকারের কঠোর হুঁশিয়ারি
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ট একটি মার্কিন তেল কোম্পানি গ্রিনল্যান্ডের দুর্গম এলাকায় তেলকূপ খননের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত উত্তর মহাসাগরের বিশালাকার এই ভূখণ্ডটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নতুন করে দেওয়া হুমকির মধ্যেই, গত কয়েক দিনে গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে তেল খননের জন্য প্রাথমিক সরঞ্জাম আনা হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া এসব যন্ত্রপাতি উপকূলে আনার ঘটনায় গ্রিনল্যান্ড সরকার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই মালামাল খালাসের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এক বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ড সরকার স্পষ্ট করে জানায়, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের লজিস্টিক সংক্রান্ত বিষয়ে খনিজ সম্পদ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে এবং কার্যক্রম পরিচালনার আগেই তাদের অনুমোদন নিতে হবে।
এর দুই দিন পরই ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে হুমকিসূচক একটি পোস্ট দেন। সেখানে তাকে গ্রিনল্যান্ডের একটি গ্রামের ওপর ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'গ্রিনল্যান্ড এনার্জি' গত বছর গঠিত হয়। কোম্পানিটির নির্বাহী কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, দেশটির জেমসন ল্যান্ড অঞ্চলের ভূগর্ভে ১ ট্রিলিয়ন (এক লাখ কোটি) ডলার মূল্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল থাকতে পারে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তারা ৬০ মিলিয়ন ডলার খরচে দুটি তেলকূপ খননের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
পরিবেশগত কারণ দেখিয়ে ২০২১ সালে গ্রিনল্যান্ড সরকার নতুন তেল উত্তোলনের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে '৮০ মাইল' নামের একটি ব্রিটিশ কোম্পানি জেমসন ল্যান্ড এলাকায় আগেই অনুসন্ধানের অধিকার পেয়েছিল। গ্রিনল্যান্ড এনার্জির করপোরেট নথি অনুযায়ী, অনুসন্ধান কার্যক্রমে অর্থায়নের বিনিময়ে তারা এই প্রকল্পের অধিকাংশ শেয়ারের মালিকানা নেবে। তবে এটি বাস্তবায়নে এখনো গ্রিনল্যান্ড সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জি ফিল ম্যাকগ্রগকে (যিনি 'ডক্টর ফিল' নামে বেশি পরিচিত) এই কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ডানপন্থী এই সাবেক জনপ্রিয় টকশো সঞ্চালক আগে ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। আধুনিককালের এই তেল অভিযাত্রীদের কার্যক্রম তুলে ধরে তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজ তৈরি করবেন।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি 'গোল্ডেন ডোম' নামের একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রকল্পে কাজ করছেন। ট্রাম্পের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার জন্য গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি৷
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির চেয়ারম্যান ও অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার ল্যারি সোয়েটস ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলয়ে যাতায়াত করেন বলে জানা যায়। তবে তিনি দাবি করেছেন, এই তেল প্রকল্পটির সঙ্গে আমেরিকার গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো সম্পর্ক নেই।
গত জুন মাসে জেমসন ল্যান্ডে স্থানীয় বাসিন্দাদের এক সভায় কোম্পানিটির এক প্রতিনিধি ভুল দাবি করেছিলেন যে, তাদের কাছে খনন যন্ত্রপাতি খালাসের অনুমোদন রয়েছে। পরবর্তীতে ল্যারি সোয়েটস বলেন, 'প্রকল্পের প্রতি আমাদের অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে এমন দাবি করা হয়েছিল, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।'
তবে এর পরের মাসেই এই স্বল্প জনঅধ্যুষিত অঞ্চলের অধিবাসীরা দেখতে পান, একটি টাগবোটের সাহায্যে একটি বার্জ তীরের দিকে টেনে আনা হচ্ছে এবং সেখান থেকে এক ডজন কনটেইনার খালাস করা হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, 'পরিকল্পিত তেল অনুসন্ধান খননের উদ্দেশ্যে জেনসন ল্যান্ডের নুন্যাপ কেক্কায় যন্ত্রপাতি পৌঁছানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য।'
ডেনমার্কের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম 'ড্যানওয়াচ'-এর কাছে জাহাজ কোম্পানির প্রধান নিশ্চিত করেছেন যে, খালাস করা মালামালগুলো গ্রিনল্যান্ড এনার্জির জন্যই আনা হয়েছিল।
সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হলে গ্রিনল্যান্ড এনার্জি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গত বৃহস্পতিবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তারা উল্লেখ করে, 'প্রকল্পের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ইতিবাচক হয়েছে। খননের জন্য অবশিষ্ট অনুমোদনগুলো পাওয়ার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে, তাতে আমরা আশাবাদী।' ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, আলোচনার পর ঠিক হয়েছে, আপাতত কেবল একটি কূপ খনন করা হবে।
ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা হওয়ায় গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের এখতিয়ার তাদের স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতেই ন্যস্ত। বর্তমানে তারা একটি জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে তারা তেল খননের অনুমতি দিতে পারেন—যদিও প্রস্তাবিত কূপগুলো 'রামসার কনভেনশন' দ্বারা সংরক্ষিত একটি জলাভূমির মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে, তারা অনুমোদন প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন, তবে অনেকের আশঙ্কা—তা ট্রাম্পকে তার সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খালাস করা যন্ত্রপাতি অবিলম্বে সরিয়ে নিতে বলা 'উপযুক্ত ও আনুপাতিক হবে না'। তবে আবেদনের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন বলে এতে জানানো হয়।
গ্রিনল্যান্ড এনার্জির এক প্রতিনিধি জানান, তাদের প্রায় ৩০০টি কনটেইনারসহ খননের আনুষঙ্গিক মালামালবাহী একটি জাহাজ আগামী ১২ সেপ্টেম্বর কানাডা থেকে রওনা হবে এবং অক্টোবর মাসে কূপ খননের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী লুইসিয়ানা অঙ্গরাজ্যের উগ্র-ডানপন্থী গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি বলেছেন, আগামী বছর থেকেই গ্রিনল্যান্ড থেকে তেল উত্তোলন শুরু হতে পারে।
