ফুরিয়ে যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পূরণের প্রতিযোগিতায় হারছে আমেরিকা!
ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কোটি ডলারের যে উদ্যোগ, তা হয়তো দেশটির প্রায় তলানিতে ঠেকা সমরাস্ত্রটির মজুত ফের গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তবে দীর্ঘ উৎপাদন সময়সীমা, শিল্প খাতের নানা প্রতিবন্ধকতা এবং ব্যয়সংক্রান্ত অসমতার কারণে এই উদ্যোগের সফলতা মূলত নির্ভর করবে—নতুন উৎপাদন সক্ষমতা কত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারছে তার ওপর।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দফতর–পেন্টাগন তাদের দুই প্রধান প্রতিরক্ষা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এবং নর্থরপ গ্রুম্যানের সঙ্গে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের একটি কাঠামোগত চুক্তি সই করেছে। প্যাট্রিয়ট এবং টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার–বিভিন্ন উপাদান ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই চুক্তি করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো প্যাট্রিয়ট এডভান্সড ক্যাপাবিলিটি-৩ (পিএসি-৩/প্যাক-৩) ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন সক্ষমতা তিন গুণ এবং থাড ব্যবস্থার (ক্ষেপণাস্ত্র) উৎপাদন চার গুণ বাড়ানো। এটি পেন্টাগনের প্রায় ১৪ হাজার ইন্টারসেপ্টর সংগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ।
মূলত ইউক্রেন ও ইরানে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা মিসাইলের যে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তা পূরণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এসব যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের মোট প্যাট্রিয়ট মজুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং থাড রিজার্ভের প্রায় অর্ধেকই ইতোমধ্যে ব্যবহার বা খরচ করে ফেলেছে।
তাই উৎপাদন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পেন্টাগন কেবল বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এর অংশ হিসেবে প্যাক-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের সলিড রকেট মোটরের জন্য বিকল্প বা দ্বিতীয় উৎস তৈরি করা হচ্ছে, ইগনিশন সেফটি ডিভাইসের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে এবং থাড সিস্টেমের মিড-বডি শেল, মাজল কভার ও রেল কার এসেম্বলির উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
বাজারে নিরবচ্ছিন্ন চাহিদা ধরে রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া এবং দক্ষ জনবল ও কারখানা আধুনিকায়নে অর্থায়নের মাধ্যমে মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করতে চান। একই সঙ্গে ইরানের তৈরি ৫০ হাজার ডলার মূল্যের কামিকাজে ড্রোন ভূপাতিত করতে ৪০ লাখ ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের মতো চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধরে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করাই তাঁদের লক্ষ্য।
তবে এই সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির আসল পরীক্ষা হলো—বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তৈরি হওয়া পর্বতসম চাহিদা মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্পখাত কতটা দ্রুত এই উন্নত ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করতে পারবে–তার ওপর। আবার আধুনিক ইন্টারসেপ্টরের এই ঘাটতি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক পুরোনো ও কম কার্যকর মডেলের ক্ষেপণাস্ত্র ফের সংগ্রহ করতে বাধ্য করছে।
সামরিক বিষয়ক গণমাধ্যম- দ্য ওয়ার জোন (টিডব্লিউজেড) গেল জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নতুন উৎপাদিত প্যাক-২ 'গাইডেন্স এনহ্যান্সড মিসাইল-ট্যাকটিক্যাল' (জিইএম-টি) প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর সংগ্রহের জন্য রেথিওন কোম্পানিকে ৪৪১.৬ মিলিয়ন ডলারের একটি সংশোধিত চুক্তি দিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী। গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে প্যাক-২ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম কোনো নতুন ক্রয়াদেশ।
তবে এসব পুরোনো মডেলের ইন্টারসেপ্টর কিন্তু নতুনগুলোর মতো ততটা কার্যকর নাও হতে পারে। যেমন, ইউরোপীয় এক কূটনীতিকের বরাতে ইউক্রেনীয় গণমাধ্যম- কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্ট গত বছরের মে মাসে এক প্রতিবেদনে জানায়, ইউক্রেনের ফুরিয়ে যাওয়া মজুত পূরণে মার্কিন অনুমোদনে জার্মানি থেকে পাঠানো প্যাক-২ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে নতুন প্যাক-৩ সংস্করণের মতো অতোটা কার্যকরী নয়।
এমনকি কিয়েভ ইন্ডিপেন্ডেন্টে উদ্ধৃত ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রাশিয়ার নতুন ওরেশনিক মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইআরবিএম) প্রতিহত করার ক্ষমতা অত্যাধুনিক প্যাক-৩ ক্ষেপণাস্ত্রেরও নেই।
ওই প্রতিবেদন অনুসারে, প্যাক-৩ মিসাইলের প্রযুক্তি 'হিট-টু-কিল' বা সরাসরি আঘাতের মাধ্যমে ধ্বংস করার ক্ষমতাসম্পন্ন করে তৈরি। অর্থাৎ এটি কোনো বিস্ফোরক ওয়ারহেড ব্যবহার না করে সরাসরি সজোরে ধাক্কা দিয়ে প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝআকাশে ধ্বংস করে দেয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টরগুলো আকারে ছোট, হালকা এবং দ্রুত দিক পরিবর্তনে সক্ষম। যেখানে একটি সাধারণ প্যাট্রিয়ট লঞ্চারে মাত্র ৪টি প্যাক-২ ক্ষেপণাস্ত্র রাখা যায়, সেখানে প্যাক-৩ রাখা যায় ১৬টি।
ইউক্রেনের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার হার ক্রমাগত কমে যাওয়া থেকেই স্পষ্ট হয় যে—মজুদের ঘাটতি, শত্রুপক্ষের একযোগে বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং দিন দিন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বিদ্যমান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর কতটা মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) ২০২৬ সালের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বেঞ্জামিন জেনসেন ও ইয়াসির আতালান উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের সাফল্য বা প্রতিহত করার হার নেমে এসেছে মাত্র ১০.৬ শতাংশে।
জেনসেন ও আতালান জানান, ইউক্রেন শাহেদ ড্রোনের মতো 'ওয়ান-ওয়ে' আত্মঘাতী ড্রোনের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ প্রতিরোধ হার ধরে রাখতে পারলেও—২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার একযোগে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পরিমাণ বেড়েছে ৭০০ শতাংশ। একই সময়ে ইউক্রেনের সাফল্যের হার কমেছে ৩৬ শতাংশ। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালে রাশিয়া হয়তো ইউক্রেনের দিকে ৮৪০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দেশটির শত শত স্থাপনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যেও পরিস্থিতি একইভাবে আশঙ্কাজনক। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এবছরের জুলাইয়ে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চালাতে এবং নিজেদের দ্রুত কমতে থাকা আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সামাল দিতে ইরানের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহের বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতে, হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সমরাস্ত্রের মারাত্মক ঘাটতির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয় যে, ইতোমধ্যে ১,৫০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর খরচ হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের অস্ত্রভাণ্ডারেই এখন ১,০০০টিরও কম অবশিষ্ট আছে।
প্রতিবেদনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যদিও ট্রাম্প প্রকাশ্যে গোলাবারুদের কোনো ঘাটতির কথা অস্বীকার করেছেন, তবে জেনারেল কেইন সতর্ক করে বলেছেন এই স্বল্পতা সরাসরি সামরিক কার্যকারিতার ওপর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই ঘাটতির কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো তো বটেই, তার চেয়েও বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে ইসরায়েল।
চলতি মাসে দ্য টেলিগ্রাফ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউএস ইউরোপিয়ান কমান্ডের (ইউকম) কমান্ডার জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচের একটি ফাঁস হওয়া গোপন মেমোতে সতর্ক করা হয়েছে যে—ফুরিয়ে আসা ইন্টারসেপ্টরের মজুত এবং যুদ্ধজাহাজের সীমাবদ্ধতার কারণে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে ইসরায়েলকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হতে পারে আমেরিকা।
ইউক্রেনের মতোই ইসরায়েলও ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে টিআরটি ওয়ার্ল্ড এই মাসে জানিয়েছে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার হার প্রায় ৯০ শতাংশ থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রতিবেদনে ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষার ওপর তৈরি হওয়া চরম চাপের কথা তুলে ধরা হয়েছে। ইরান এখন আরও দ্রুতগতির ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অস্ত্র প্রয়োগ করছে—যার মধ্যে রয়েছে একাধিক ওয়ারহেডযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক টনেরও বেশি বিস্ফোরক বহনকারী ভারী ওয়ারহেড। ফলে ইসরায়েলের আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় ১০ মিনিট থেকে কমে মাত্র ৬ মিনিটে নেমে এসেছে। উপরন্তু, ইরানের অব্যাহত ও সমন্বিত পাল্টা হামলাগুলো— আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জ্যামিতিক হিসাবকে ওলটপালট করে দিচ্ছে এবং জটিল ইন্টারসেপ্টরের মজুতও দ্রুত শেষ করে ফেলছে।
পূর্ব ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে মার্কিন ইন্টারসেপ্টরের এই ঘাটতির প্রভাব পড়তে পারে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও। দ্য স্ট্র্যাটেজিস্ট-এ ২০২৬ সালের মার্চে লেখা এক নিবন্ধে ডেভিড অ্যাক্স উল্লেখ করেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির দিক থেকে ইরানের চেয়ে চীন বহুগুণ বেশি বিপজ্জনক।
তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, চীনের অত্যন্ত উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য থাড এবং এসএম-৬-এর মতো ইন্টারসেপ্টরগুলোই সেরা, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র প্রতিরক্ষা কবচ।
ডেভিড অ্যাক্স লিখেছেন যে, 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরু হওয়ার আগেও চীনের সম্ভাব্য সর্বাত্মক হামলা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত সেরা ইন্টারসেপ্টর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল না; আর বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ফুরিয়ে যাওয়া মজুদ ফের গড়ে তুলতে মার্কিনদের অন্তত ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগবে। আর এই সময়টিতে চীনের আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টরের ব্যবধান হবে সবচেয়ে বেশি। ঠিক এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েই চীনের নীতিপ্রণেতারা সামরিক শক্তিতে তাইওয়ান দখলের চেষ্টা চালাতে পারেন।
কিন্তু কেবল মুখে বড় বড় উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করলেই প্যাট্রিয়টের উৎপাদন রাতারাতি বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্যাট্রিয়ট উৎপাদন সম্প্রসারণের প্রতিবন্ধকতা বিশ্লেষণ করে ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এফপিআরআই) ২০২৬ সালের মে মাসের এক প্রতিবেদনে ম্যাকডোনাল্ড আমোয়াহসহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, প্যাক-৩ 'মিসাইল সেগমেন্ট এনহ্যান্সমেন্ট' (এমএসই) ইন্টারসেপ্টরের জন্য দীর্ঘ সময়সীমার প্রয়োজন হয়—শুধু ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করতেই লাগে ২৪ মাস এবং সলিড রকেট মোটর পুরোপুরি প্রস্তুত হতে ৩০ মাস সময় লাগে। ফলে জরুরি চুক্তির আওতায় সরবরাহ পেতে বছরজুড়ে বিলম্ব ঘটে।
আমোয়াহ ও তাঁর সহযোগীরা আরও যোগ করেন, উৎপাদনে গতি না পাওয়ার পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার একক নির্ভরতাও এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। যেমন, হান্টসভিলে বোয়িংয়ের একমাত্র 'সিকার' তৈরির প্ল্যান্ট এবং এলথ্রিহ্যরিস অ্যারোজেট রকেটডাইন- এর সীমিত পরিসরে রকেট মোটর উৎপাদন পুরো প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে রাখছে।
তাঁরা আরও উল্লেখ করেছেন যে, পেন্টাগনের অস্থির বা অনিয়মিত চাহিদা এবং সরবরাহকারী নির্বাচনের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রতিরক্ষা শিল্পমালিকরা বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি বা দক্ষ জনবল বাড়াতে—দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। ফলে বর্তমানে জরুরি মুহূর্তে তারা উৎপাদন হুট করে বাড়িয়ে নিতে পারছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ দেশগুলো যেভাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের বহর বাড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার চেয়ে দ্রুত গতিতে অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতের এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে না পারে, তবে ফুরিয়ে যাওয়া মজুদের এই শূন্যতা ওয়াশিংটনকে কঠিন সংকটে ফেলবে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াবে যে ইউক্রেন, ইসরায়েল কিংবা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যে আকাশ প্রতিরক্ষা ভাগাভাগি করতে রেশনিং পদ্ধতির আশ্রয় নিতে হবে মার্কিনদের।
আর ইন্টারসেপ্টরের এই ঘাটতিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে—বিশ্বের কোথায় ও কখন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করার সামর্থ্য রাখবে, যা তাদের বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে চরম কৌশলগত সীমানায় আটকে দেবে।
