শয্যা বাড়িয়ে তিনগুণ, তবে বাড়েনি জনবল; সেবা ব্যাহত ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালে
ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালটি আগে ৫০ শয্যার ছিল। তবে ২০২০ সালে এর সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৫০ শয্যার করা হলেও তীব্র জনবলসংকটের কারণে এখনো নিয়মিত অস্ত্রোপচার, আলট্রাসনোগ্রাফি, আইসিইউ ও দন্তসেবা চালু করা যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৬ সালের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী অনুমোদিত ১৬৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৫৬ জন। ফলে অনেক শয্যাই অব্যবহৃত পড়ে আছে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, সরকারের জনবল কাঠামো অনুযায়ী হাসপাতালটিতে অন্তত ১৮৫ জন কর্মী থাকার কথা। তবে সেই জনবল কাঠামো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হাসপাতালটিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ২০২০ সালের মার্চে ১৫০ শয্যার বিশেষায়িত কোভিড-১৯ বা আইসোলেশন হাসপাতাল হিসেবে প্রস্তুত করা হয়।
হাসপাতালটির ভবন, ওয়ার্ড, কেবিন, অপারেশন থিয়েটার ও যন্ত্রপাতি সবই ১৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্তমান জনবল দিয়ে ৫০ শয্যার সেবাও যথাযথভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরামর্শক ও চিকিৎসকসংকটে ব্যাহত সেবা
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে কোনো সার্জারি কনসালটেন্ট বা পরামর্শক নেই। ফলে নিয়মিত অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালের সাতটি পরামর্শক পদের মধ্যে মাত্র দুটি পদে জনবল রয়েছে। মেডিসিন ও স্ত্রীরোগ বিভাগে একজন করে পরামর্শক আছেন। তবে কর্মকর্তারা জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ পরিচালনায় অন্তত দুজন থেকে তিনজন পরামর্শক প্রয়োজন।
হাসপাতালটির পরিচালকের পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে স্ত্রীরোগ বিভাগের একজন পরামর্শক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
দুটি আবাসিক সার্জনের পদের মধ্যে একটি পদ শূন্য রয়েছে। আবাসিক চিকিৎসকের পদেও স্থায়ী কোনো নিয়োগ নেই। অন্য একজন চিকিৎসক সাময়িকভাবে এ দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুমোদিত ১৯টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে ১১টি পূরণ হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রেষণে কর্মরত অথবা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
নার্সসংকট আরও প্রকট। ৩১টি স্টাফ নার্স পদের মধ্যে মাত্র ১২টি পূরণ হয়েছে।
অপারেশন থিয়েটার নার্সের দুটি পদই শূন্য। এছাড়া ম্যাট্রনের পদেও কোনো স্থায়ী নিয়োগ নেই।
অব্যবহৃত পড়ে আছে যন্ত্রপাতি
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের পরামর্শকেরা অবসরে যাওয়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ না দেওয়ায় প্যাথলজি ও রেডিওলজি পরামর্শকের পদ শূন্য রয়েছে। আলট্রাসনোগ্রাফি সেবাও রয়েছে বন্ধ।
হাসপাতালের একমাত্র দন্তচিকিৎসকের পদটিও শূন্য। ফলে আধুনিক ডেন্টাল চেয়ারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে আছে।
তারা আরও জানান, একটি প্রকল্পের সহায়তায় স্ত্রীরোগ বিভাগে সিজারিয়ানসহ এখনও কিছু অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। তবে গত বছর চালু হওয়া স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি-সেবা পরে বন্ধ হয়ে যায়।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় চালু করা পাঁচটি আইসিইউ ও হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটের শয্যাগুলো জনবল ও অর্থসংকটের কারণে সচল রাখা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
চার থেকে পাঁচ বছর পর শয্যাগুলো সরিয়ে নরসিংদী ও নওগাঁর হাসপাতালে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বর্তমানে হাসপাতালটিতে কোনো আইসিইউ বেড নেই।
নিবিড় পরিচর্যা সেবা চালুর জন্য স্থাপন করা তরল অক্সিজেন ট্যাংকটিও হাসপাতালে অব্যবহৃত পড়ে আছে।
সরেজমিন পরিদর্শনে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের খোলা জায়গায় বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের স্তূপ দেখা যায়। পচা খাবার ও প্লাস্টিকের দুর্গন্ধ হাসপাতালসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল।
বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ রোগী
ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. সাকিলা খাতুন বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৩০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে জনবলসংকটের কারণে অনেক শয্যা অব্যবহৃত পড়ে থাকে।
তিনি বলেন, "এত কম নার্স দিয়ে ৫০ শয্যাই পরিচালনা করা কঠিন, ১৫০ শয্যা তো দূরের কথা। অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরও পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া না হলে প্রকল্পটি কার্যত অর্থহীন হয়ে থাকবে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা অনেকবার জনবল চেয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু কেন নিয়োগ দেওয়া হয়নি, তা জানি না। তবে কর্তৃপক্ষ এবার জনবল নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছে।"
ধাপে ধাপে জনবল নিয়োগের আশ্বাস ঢাকা দক্ষিণের
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান চিকিৎসক, পরামর্শক ও নার্সসংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত ছিল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নথিগুলো অনুমোদন পেয়েছে।
তিনি জানান, "পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হবে।"
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান ছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, "সিটি করপোরেশন সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হাসপাতালগুলো পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করছে।"
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জহিরুল বলেন, হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা সবার যৌথ দায়িত্ব এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে করপোরেশন কাজ করছে।
