ট্যাক্স ফাইলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হচ্ছে
কর ফাঁকি দেওয়ার একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত পথ বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছর থেকে আয়কর রিটার্নে উত্তরাধিকার সূত্রে বা উপহার হিসেবে পাওয়া সম্পদের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বহু বছর ধরে ধনী করদাতারা তাদের আয়কর রিটার্নে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, জমি ও স্বর্ণ পাওয়ার পর ওইসব সম্পদের ক্ষেত্রে বলা হয় 'মূল্য অজানা'। এর ফলে এ ধরনের করদাতাদের কোটি কোটি টাকার বাস্তব সম্পদ থাকলেও এসব সম্পদের ওপর সরকার কোনো ধরনের রাজস্ব পায় না।
সংশ্লিষ্ট এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, এই চর্চা এবার বন্ধ হতে যাচ্ছে। নতুন উদ্যোগের আওতায় এ ধরনের সমস্ত সম্পদের অর্থমূল্য করদাতার ট্যাক্স ফাইলে যুক্ত করতে হবে রিটার্ন জমার সময়।
বাংলাদেশে সম্পদ কর নেই, তবে চার কোটি টাকার উপরে সম্পদ থাকলে প্রতি বছরের আয়ের উপর সারচার্জ দিতে হয়। এনবিআর কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন করে ভ্যালুয়েশন করা হলে প্রায় চার হাজার নতুন করদাতা ওই সারচার্জের আওতায় আসবে। পাশাপাশি সারচার্জের আওতায় থাকা বিদ্যমান করদাতাদেরও সম্পদের পরিমাণ বাড়বে।
স্বাগত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
এনবিআরের কর নীতি শাখার সাবেক সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস বিদ্যমান নিয়মকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'বিপুলসংখ্যক করদতাদা আছেন, যারা কোটি কোটি, কিংবা শত কোটি টাকার সম্পদ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, কিন্তু ট্যাক্স ফাইলে থাকে "মূল্য অজানা"। এটা একটা খারাপ চর্চা।'
'সম্পদ আছে কিন্তু তার মূল্য নেই—এমন সম্পদ হয় নাকি? এই সম্পদের ভ্যালুয়েশন দরকার, যাতে অন্তত কিছু ব্যক্তি সারচার্জের আওতায় আসেন এবং যারা দিচ্ছেন, তার পরিমাণ বাড়ে,' বলেন তিনি।
শাশা ডেনিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে একে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এইভাবে সম্পদের 'মূল্য অজানা' দেখানোর দুর্নীতিরও 'যোগসূত্র' রয়েছে। সম্পদের মূল্য দেখানোর বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হলে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর পাশাপাশি এনবিআরের সারচার্জের হার আরো কমিয়ে আনা উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কর ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হচ্ছে ভূমির রেকর্ড
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, শিগগিরই এনবিআর দেশের ভূমি অফিস থেকে বিভিন্ন এলাকা অনুযায়ী বিগত ৪০ বছরের মৌজা মূল্যের তথ্য নেবে। সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ সহজ করতে এই তথ্য অনলাইন ট্যাক্স রিটার্ন সিস্টেমে যুক্ত করা হবে।
এর ফলে আগামী বছর যারা রিটার্ন জমা দেবেন, তারা জমি, ফ্ল্যাট কিংবা স্বর্ণালঙ্কারের মূল্য 'অজানা' দেখানোর সুযোগ আর পাবেন না বলে আশা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, তারা আশা করছেন, এই পদ্ধতিতে ভ্যালুয়েশনের কারণে নতুন করে প্রায় ২ হাজারের ব্যক্তি চার কোটি টাকার সম্পদের সীমা অতিক্রম করবেন। আর যারা বর্তমানে এই সীমা অতিক্রম করেছেন, তাদেরও সম্পদের অর্থমূল্যের পরিমাণ বাড়বে।
এর মাধ্যমে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাড়তি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
আরেকজন কর্মকর্তা জানান, জুলাইয়ের মধ্যে আয়কর পরিপত্র প্রকাশ করা হবে এবং কীভাবে এ ভ্যালুয়েশন করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করা হবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, কিছু করদাতা উত্তরাধিকার সূত্রে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ি পান, কয়েকশো বিঘা কৃষি বা অকৃষি জমি পান, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার পালন। কিন্তু ট্যাক্স ফাইলে এসব সম্পদের বিষয়ে তথ্য থাকে 'মূল্য অজানা'।
তিনি আরও বলেন, অর্জনকালীন সময়ের মৌজা ভ্যালু অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যাবে, এসব সম্পদের দাম কয়েক কোটি টাকা। 'মূল্য অজানা' দেখানোর ফলে ওই করদাতারা অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে সারচার্জযোগ্য সম্পদের নিচে থেকে যাচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে।
তিনি বলেন, এই অজানা মূল্য আসলে সম্পদের সারচার্জ ফাঁকি দেওয়ার একটা কৌশল।
বর্তমান সারচার্জ কাঠামো
এনবিআরের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার ব্যক্তি তাদের সম্পদের উপর সারচার্জ পরিশোধ করেন, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।
বর্তমানে কোনো ব্যক্তির সম্পদের মূল্য ৪ কোটি টাকার বেশি হলে তিনি সারচার্জের আওতায় আসেন। সারচার্জের পরিমাণ ১০ শতাংশ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, সম্পদের মূল্য চার কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা হলে সারচার্জ ১০ শতাংশ, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের উপর ২০ শতাংশ, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার সম্পদের উপর ৩০ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ হলে তার ৩৫ শতাংশ হারে সারচার্জ রয়েছে।
সারচার্জ প্রদেয় করের ওপর হিসাব করা হয়। ধরা যাক, কোনো করদাতা এক বছরের জন্য ২ লাখ টাকা আয়কর দিলেন, কিন্তু তার সম্পদের পরিমাণ ৭ কোটি টাকা। তাহলে তার উপর ১০ শতাংশ সারচার্জ হিসেবে বাড়তি দিতে হবে ২০ হাজার টাকা।
