লাইফলাইনের অপেক্ষায়
দেশের বর্তমান নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভালোভাবেই অবগত।
তিনি জানেন, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন অর্থবছরের আসন্ন বাজেটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার পর্যায়ে নিয়ে আসার একটি 'হারকিউলিয়ান মিশনে' (অত্যন্ত কঠিন) নেমেছেন তিনি।
গত চার বছর ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে, বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
দীর্ঘমেয়াদে ক্রয়ক্ষমতার ধারাবাহিক অবনতি ভবিষ্যতের ওপরও গভীর ছায়া ফেলছে।
টিকে থাকতে অনেক পরিবার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং পুষ্টির মতো মৌলিক খাতে ব্যয় কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে।
যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছেন বা ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছেন—তারা এই ক্ষতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আরও বহু বছর সংগ্রাম করবেন।
টানা তিনটি সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে; বিশেষ করে তখন, যখন বাস্তবে আয় কমে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন বাজেটের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সংকট কবে শেষ হবে? অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান একসময় উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে 'একটি বিপজ্জনক এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতী রোগ' হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা সময়মতো নিয়ন্ত্রণ না করলে পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া অর্থবছরের জন্য নতুন সরকারের কর ও ব্যয় প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার। স্বাভাবিকভাবেই সেই সময় তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন।
তবে অর্থমন্ত্রী যে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, তা মোটেও সুখকর নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক বর্তমানে বেশ দুর্বল অবস্থায় থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বস্তির তেমন সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট অন্যদের মতো অর্থমন্ত্রী নিজেও এটি ভালোভাবেই বোঝেন, গত ফেব্রুয়ারির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা তার সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো থমকে যাওয়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো। স্থবির হয়ে পড়া শ্রমবাজার পুনরুজ্জীবিত করা এখন একটি জরুরি অগ্রাধিকার।
মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা।
নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। তবে, বর্তমানে জ্বালানি সংকট এবং নীতিমালার অনিশ্চয়তা এই বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—সবাই এখন এই সংকট থেকে উত্তরণের আশায় রয়েছে।
সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হবে। তবুও অর্থমন্ত্রী তার দলের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে, যার মধ্যে 'ফ্যামিলি কার্ড' ও 'কৃষক কার্ড'-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
একটি বিষয় নিশ্চিত: অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেসে এমন কোনো জাদুর কাঠি নেই যা দিয়ে রাতারাতি সরকারের রাজস্ব আয় নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
ফলে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সামনে ঋণ নেওয়া ছাড়া খুব বেশি বিকল্প নেই। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে এই বাড়তি ঋণ নেওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত দেশের ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
নতুন বাজেট দেশের জিডিপি, জনসংখ্যা এবং বর্তমান সময়ের চাহিদার তুলনায় খুব বড় হবে না। তবে এর বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও ধীরগতির, সেখানে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় তাদের বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সংস্কারের অভাব থেকে সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সরকারের আয় এবং ব্যয়—উভয় খাতের জন্যই বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
সব প্রতিকূলতার মাঝেও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ক্ষমতাসীন দলের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদের রাজকোষের অভিভাবক হিসেবে প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির মানোন্নয়নে এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর সংস্কারের বিপরীতে আসা অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যিনি ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, বৃহস্পতিবার সংসদে বাংলাদেশের ৫৪তম বাজেট পেশ করবেন।
সর্বশেষ ২০০৬ সালের জুনে একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বাজেট পেশ করেছিলেন।
দীর্ঘ দুই দশক পর এবার পালা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দলের পক্ষে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।
লন্ডনে মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠক আয়োজন করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
অর্থমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রীর পর মন্ত্রিসভার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তার পূর্বসূরিদের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং সাইফুর রহমান নিজ নিজ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে সর্বোচ্চ ১২টি করে বাজেট পেশ করেছেন।
তাদের সময়ের রাজনৈতিক অর্থনীতির চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মুহিত আওয়ামী লীগের কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন না এবং তার কোনো রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল না। তিনি শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট পেশ করেছিলেন।
তার উত্তরসূরি আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচটি বাজেট পেশ করেন। ওই সময়ে রাজনৈতিক অর্থনীতি দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক বৈপরীত্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত হয়েছিল, যেখানে প্রবৃদ্ধি হলেও তাকে 'কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি' হিসেবে দেখা হতো। তবে ওই শাসনামলের সবচেয়ে অশুভ দিক ছিল রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট 'ক্রোনি ক্যাপিটালিজম' বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ, যা ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের আগে 'ক্লেপটোক্র্যাসি' বা চোরতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল বলে জানা যায়।
উভয় অর্থমন্ত্রীই মন্দ রাজনীতিকে বাজেট নীতি বিকৃত করা এবং অর্থনীতি, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতকে প্রভাবিত করা থেকে রুখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
অন্যদিকে সাইফুর রহমান, যিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একজন জ্যেষ্ঠ বিএনপি নেতা ছিলেন, তিনি খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬ মেয়াদে টানা ১০টি বাজেট পেশ করেছিলেন।
সেই সময়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থেকে উদার ও বাজার-ভিত্তিক ব্যবস্থায় এক মৌলিক রূপান্তরের মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছিল।
ওই সময়কালে বেসরকারি খাত প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প একটি শক্ত ভিত্তি পায়। সাইফুর মন্দ রাজনীতি থেকে অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পেরেছিল। তবে এটি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং বিদায়ী শাসনামলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেনি।
তাই, এই উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে যে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে আগের মতোই দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা দেখা দিতে পারে, যা কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করবে।
সরকারি ব্যয় এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, ইন্টারন্যাশনাল বাজেট পার্টনারশিপ কর্তৃক পরিচালিত ২০২৩ সালের ওপেন বাজেট ইনডেক্স (ওবিআই) অনুযায়ী, রাজস্ব নীতিতে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে মাত্র ৩৭ পেয়েছে।
এই স্কোরটি বৈশ্বিক গড় ৪৫-এর চেয়ে অনেক নিচে। বাংলাদেশ আইনের শাসন, দুর্নীতি এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মতো অন্যান্য সূচকেও খারাপ স্কোর করেছে, যা একটি দুর্বল ও নাজুক শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অর্থমন্ত্রী হয়তো তার পূর্বসূরিদের ওপর দোষ চাপাতে পারেন, যারা গত দুই দশক অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
কিন্তু এটি তার লড়াইয়ের তীব্রতা কমাবে না। তবে তার পূর্বসূরিদের মতো তিনিও সংসদের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাজেট প্রস্তাবের ওপর কম বিচার-বিশ্লেষণের এক 'সহজাত আশীর্বাদ' ভোগ করবেন।
এ ধরণের আশীর্বাদ শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্বচ্ছতাকে নষ্ট করে। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের লড়াইয়ে তিনি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভব করবেন।
গত দুই বছর ধরে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা পুনরুজ্জীবিত করতে ও পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার জন্য একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় ছিলেন। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের প্রতি তাদের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি দেশকে গড়ে তোলা অনেক সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং তার সরকারের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট।
বাংলাদেশ এখন যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু অর্থনীতি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, কেবল গভীর ও মজবুত শেকড় থাকা গাছই ঝড় মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারে।
