কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা রাজস্ব ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে: বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
পূর্ণাঙ্গ একটি কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নেই। করের আওতা বা রাজস্ব ভিত্তি না বাড়িয়ে এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না করে—কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটানো হলে, তা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আজ বুধবার (১০ জুন) আয়োজিত এক সংলাপে অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকেরা এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
'ভয়েস ফর রিফর্ম' নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত "কল্যাণ রাষ্ট্রের পথে নতুন সরকারের ১ম বাজেট: সামাজিক সুরক্ষার ভূমিকা কতটুক?" শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এই হুঁশিয়ারি দেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা, বৈষম্য এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনোভিশন কনসাল্টিং-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রুবাইয়াত সারওয়ার। তিনি বলেন, কল্যাণমূলক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ কেবল ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়, এর জন্য কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। দেশে ২২.৯ শতাংশ দারিদ্র্যের হার এবং ০.৪৯৯ গিনি সহগ (যা বৈষম্য নির্দেশ করে)-এর কথা উল্লেখ করে তিনি সীমিত সম্পদের সুনির্দিষ্ট ও সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তিনি এই প্রক্রিয়ায় চার ধাপের একটি ধারাবাহিক পদক্ষেপের প্রস্তাব পেশ করেন: আয় বৃদ্ধি বা রাজস্ব সংস্কার, যৌক্তিকীকরণ বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সমন্বয়, আওতা সম্প্রসারণ বা সুনির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো এবং পরবর্তীতে আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে সেবাকে সর্বজনীন করা।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিএবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হতে হবে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বিনিয়োগ—যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়ন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, কর্মসংস্থানের ধীরগতির কারণে দক্ষ কর্মীরাও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনের অর্জনগুলো এখনও অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাপকভাবে কল্যাণমূলক কর্মসূচির প্রসারের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতা নেই। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে একই সুবিধার পুনরাবৃত্তির প্রবণতা কমিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত সুনির্দিষ্ট সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বান জানান।
ফাহমিদা খাতুন ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা ও নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার উদাহরণ টেনে গ্রিস এবং ভেনেজুয়েলার মতো সংকটের ঝুঁকির ব্যাপারেও সতর্ক করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ক্রমবর্ধমান ঋণ, তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওঠানামার কারণে বাংলাদেশও একই ধরণের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখোমুখি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা নিহাদ কবিরসহ অন্যান্য বক্তারাও একই মত প্রকাশ করে বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণেই আটকে থাকবে।
