৯০ মিনিটের ক্যানভাসে তুলির আঁচড়
ফুটবল মানেই তো মাঠ কাঁপানো উত্তেজনা। গ্যালারি-ভরা উন্মাদনা। আর বুটের লড়াই। কিন্তু এই চেনা দৃশ্যের বাইরেও ফুটবলের একটা অন্য রূপ আছে। সচরাচর সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও শিল্পীদের মনে দোলা দেয়। একটা ফুটবল ম্যাচ মানে তো কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এর ভেতর লুকিয়ে থাকে মানুষের চেনা-অজানা একরাশ আবেগ। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিশ্বের নানা প্রান্তের আঁকিয়েরা আবার প্রমাণ করলেন, ফুটবল মাঠের এই ৯০ মিনিট আসলে আস্ত একটা মানবজীবন। তাদের সৃজনশীলতার উর্বর এক চারণভূমি। এই চারণভূমির গল্পই লিখেছেন জ্যাকি রোল্যান্ড।
কুয়াশা-মোড়ানো মাঠ আর হাজারো মানুষের টান
কনকনে শীতের এক বিকেল। কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের নিচে ওভারকোট মুড়ি দিয়ে একদল মানুষ গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলেছে স্টেডিয়ামের দিকে। চারপাশ থেকে শয়ে শয়ে মানুষ এসে মিশছে একই মোহনায়। গ্যালারি কানায় কানায় ভরতে শুরু করেছে। কিন্তু আসল যে খেলা-সেই ফুটবল মাঠের দেখাই মিলছে না ঠিকঠাক। দূরে আবছা দেখা যাচ্ছে কলকারখানা আর উঁচু উঁচু চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া।
ব্রিটিশ শিল্পী এল এস লাউরি তাঁর বিখ্যাত 'গোয়িং টু দ্য ম্যাচ' ছবিতে ঠিক এই দৃশ্যটাই ফুটিয়ে তুলেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উত্তর ইংল্যান্ডের ফুটবল ম্যাচের আগের সেই চিরচেনা আবহাওয়া বন্দী হয়েছিল তাঁর ক্যানভাসে। উত্তর ইংল্যান্ডের স্যালফোর্ডের 'দ্য লাউরি কালেকশন'-এর কিউরেটর ক্লেয়ার স্টুয়ার্ট বলেন, লাউরি ফুটবল ম্যাচের চেয়েও বেশি মজেছিলেন মানুষের এই একসাথে জড়ো হওয়ার চেনা রীতিতে। সময় বদলেছে। স্টেডিয়াম আধুনিক গড়ন পেয়েছে। টিকিটের দাম দিনে দিনে বেড়েছে। আর মাঠের খাবার? তার মানও হয়তো ভালো হয়েছে। পরিবর্তনেও অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে। আজও ম্যাচ শুরুর আগের সেই বুক ঢিপঢিপ করা উত্তেজনা একটুও বদলায়নি। লাউরির অঙ্কন এই অনুভবকে দৃশ্যগ্রাহ্য করে ধরে রেখেছে।
ফুটবল সম্ভবত এই গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এই খেলা মানুষের মনে একই সাথে ভালোবাসা আর ক্ষোভের মতো বিপরীতমুখী আবেগের জন্ম দেয়। সর্বজনীনতাই এমন রূপ ফুটবলকে ভিজ্যুয়াল আর্ট বা দৃশ্যশিল্পের এক শক্তিশালী উপাদান বানিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকো-এই তিন দেশে যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাচ্ছে। আর সময়ের এই তরঙ্গের দোলায় এই শিল্পের আবেদন আরও ছড়িয়ে পড়েছে।
জার্সি থেকে পোস্টার: শিল্পের নিজস্ব দাপট
বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলোর পোস্টারের পাশাপাশি টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল পোস্টারটি দেখলেই বোঝা যায় ফুটবলের সাথে শিল্পের মেলবন্ধন কতটা গভীর। তিন দেশের শিল্পীদের যৌথ প্রয়াসে তৈরি এই পোস্টারে ফুটে উঠেছে আদিবাসী ঐতিহ্য। শহরের স্ট্রিট আর্ট আর জাতীয় পতাকার রং। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের আলাদা পরিচয় যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি দেখিয়েছেন সংস্কৃতির মেলবন্ধনও।
তাছাড়া এবারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বেড়ে ৪৮টি হওয়ায় আফ্রিকা মহাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক দেশ অংশ নিচ্ছে। আর এই দেশগুলোর জার্সির ডিজাইনেও লেগেছে সে মহাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির স্পর্শ। মিসরের লাল জার্সির কোনাকুনি কালো নকশা মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিক লিপির কথা। মরক্কোর অ্যাওয়ে জার্সি তৈরিতে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে তাদের ঐতিহ্যবাহী জ্যামিতিক টাইলস থেকে। আবার দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সিটি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে তাদের দেশের একটি-দুটি নয়, ১২টি অফিশিয়াল ভাষাকে।
স্টেডিয়ামের ভেতর যখন আর্ট গ্যালারি
উত্তর লন্ডনের এক ব্যস্ত রাস্তা। চপ-কাবাবের দোকান আর মুদিখানার ভিড়ের মাঝে হঠাৎ চোখ আটকে যাবে কাচ আর স্টিলের তৈরি এক বিশালাকার চকমকে স্থাপনার দিকে। দেখে মনে হবে যেন ভিনগ্রহের কোনো যান এসে নেমেছে ব্যস্ত শহরের এই বুকে! এই হলো টটেনহ্যাম হটস্পার স্টেডিয়াম। আধুনিক প্রযুক্তির এই স্টেডিয়ামের ভেতরেই গড়ে উঠেছে এক অদ্ভুত আর্ট স্পেস। নাম 'উফ গ্যালারি'। শিল্প আর ফুটবলের মিলনমেলা বলা যায় একে।
এই গ্যালারির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং শিল্প সমালোচক এডি ফ্রাঙ্কেল বলেন, তাঁর ফুটবল আর শিল্প-দুটোর প্রতিই অসম্ভব ভালোবাসা ছিল, কিন্তু আগে দুটোকে মেলাতে পারতেন না। পরে শিল্পকলার ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে তিনি দেখেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিল্পীরা তাঁদের কাজে ফুটবলের নানা রূপ ব্যবহার করে আসছেন। সেই ভাবনা থেকেই গ্যালারির জন্ম।
ফ্রাঙ্কেল বিশ্বাস করেন, ফুটবল হলো আসলে আমাদের এই সমাজেরই একটা ছোট রূপ। ফুটবল মাঠে যা যা ঘটে, তার সবকিছুই বাস্তব জগতেও ঘটে।
আমেরিকান শিল্পী পেইন প্রফিটও এই দর্শনেই বিশ্বাসী। ১৯৯৪ সালে ছাত্রাবস্থায় ইংল্যান্ডে আসার পর ফুটবলের প্রেমে পড়েন তিনি। তাঁর অনেক ছবির মধ্যেই একটা সহজ-সরল, কমিক স্ট্রিপের মতো আমেজ পাওয়া যায়-যেখানে শীতের বৃষ্টিতে ভিজে মাফলার জড়িয়ে সমর্থকেরা চিৎকার করছেন। প্রফিটের মতে, হতাশা, রাগ, মন খারাপ-এগুলো ফুটবলেরই অংশ। আর এই গভীর আবেগগুলোই শেষমেশ ক্যানভাসে দক্ষ হাত আর সৃজনশীল মননের ছোঁয়ায় শিল্পের রূপ নেয়।
পরাবাস্তববাদের ফুটবল দর্শন
লাউরি যেখানে ফুটবলকে প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হিসেবে এঁকেছেন। কিন্তু পরাবাস্তববাদী বা সাররিয়ালিস্ট শিল্পীরা হেঁটেছেন একদম ভিন্ন পথে। বাস্তব রূপ বাদ দিয়ে তারা বেছে নিয়েছেন স্বপ্নের মতো এক জগৎ। ১৯৭৪ সালে স্প্যানিশ ক্লাব এফসি বার্সেলোনার ৭৫তম বার্ষিকীর পোস্টারে সালভাদর দালি এবং জোয়ান মিরো ফুটবলের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ দেখিয়েছিলেন।
দালি তাঁর কলম আর কালির আঁচড়ে ফুটবলারকে বানিয়েছিলেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা, যার বুকের ভেতরটা ফাঁপা আর সেখান দিয়ে দেখা যাচ্ছে বার্সেলোনার লোগো। দালির এই প্রতীকী রূপ ফুটবল আর ক্লাবকে এক পৌরাণিক উচ্চতায় নিয়ে যায়। ডালিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মন্তসে আগুয়ের জানান, দালি মূলত ফুটবলের প্রতি মানুষের যৌথ আবেগ এবং আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আগ্রহী ছিলেন।
অন্যদিকে মিরো পুরো খেলাটাকে এঁকেছিলেন একটি কালো পোকার মতো অবয়বে, যার পিঠে ছিল ক্লাবের লোগো। পরে মিরো ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোস্টারও ডিজাইন করেন, যেখানে উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে খেলাধুলার উৎসবমুখর রূপটা ফুটে ওঠে।
আজকের যুগের শিল্পীরাও এই ধারণাগুলোকে নতুনভাবে নতুন মাধ্যমে রূপ দিচ্ছেন। যেমন আলজেরীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি শিল্পী লেম্যান লাচিন উফ গ্যালারিতে থাকাকালীন সুতোয় টানা পুতুলের মতো ফুটবলারদের ভাস্কর্য তৈরি করেছিলেন। তাঁর মতে, ফুটবল খেলতে যে উগ্র বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রয়োজন হয়, তা যেন কোনো এক অদৃশ্য পুতুলনাচের সুতোর টানেই চালিত হয়।
রাজপথ থেকে গ্যালারি: এক আদিম স্পিরিট
ফুটবল শুধু একা কোনো শিল্পীকে নয়, মেলাতে পারে হাজারো মানুষকেও। গ্যালারিতে বসে হাজার হাজার সমর্থক মিলে যখন বিশাল সব ব্যানার বা রঙিন কার্ড দিয়ে কোরিওগ্রাফি তৈরি করেন, তখন পুরো গ্যালারিটাই একটা জীবন্ত শিল্পকর্মে রূপ নেয়, যাকে বলা হয় 'টিফো'। মেক্সিকোর তিগ্রেস ক্লাব থেকে শুরু করে তিউনিসিয়ার এস্পেরান্স স্পোর্টিভ-সবখানেই সমর্থকেরা এই মানব মোজাইকের মাধ্যমে নিজেদের আবেগ আর পরিচয় তুলে ধরেন।
আবার বার্সেলোনার এক পার্কের দেয়ালে দেয়ালে দেখা মেলে স্ট্রিট আর্টের। মেক্সিকান স্ট্রিট আর্টিস্ট হুয়ান্দ্রেস ভেরা দুই বন্ধু দাজের রামিরেজ এবং পিটার ওয়েস্টারিনককে সাথে নিয়ে মেক্সিকোর এক দেয়ালে এঁকেছেন এক জোড়া পুরোনো, নোংরা ফুটবল বুট, যা ফিতে দিয়ে ঝুলছে। থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক চাতুরীর কারণে এক কোণ থেকে দেখলে মনে হয় বুটজোড়া বুঝি সত্যি সত্যিই ঝুলছে। ভেরা আক্ষেপ করে বলেন, এখনকার ফুটবল মানেই টাকা আর ব্যবসার খেলা। তাই বিংশ শতাব্দীর এই বুটজোড়া এঁকে তারা ফুটবলের সেই পুরোনো, খাঁটি স্পিরিটকে সম্মান জানিয়েছেন।
নারীদের ফুটবল আর ক্যানভাসের গতি
ফুটবলের এই গতিশীল শক্তিকে স্থির চিত্রে রূপ দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। ব্রিটিশ শিল্পী এমা কাজিন ফুটবলারদের ভিডিও ফুটেজ দেখে বোঝার চেষ্টা করেছেন কীভাবে আবেগ শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। তিনি বলেন, উত্তেজনায় যখন মুখাবয়ব বিকৃত হয়ে যায়, তা দেখতে যন্ত্রণাদায়ক মনে হলেও আসলে তা হলো গভীর ভালোবাসা আর আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। ২০১৯ সালের নারী বিশ্বকাপের সময় তাঁর আঁকা একটি ছবিতে নারী ফুটবলারদের সংঘর্ষের এমন এক রূপ ফুটে উঠেছিল, যা দেখলে মনে হয় শরীরগুলো ক্যানভাস ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে।
নারীদের এই ফুটবল ম্যাচই আবার অনুপ্রাণিত করেছে ব্রিটিশ ভাস্কর এসি লারসেনকে। তিনি কনক্রিটের ওপর ১১টি জ্বলন্ত মোমবাতি বসিয়ে ২০২৫ সালের উইমেনস ইউরোতে ইংল্যান্ড দলের জয়ী ফর্মেশনের একটা রূপ তৈরি করেছেন, যার নাম দিয়েছেন 'কমিউনিয়ন'। লারসেন বলেন, মোমবাতির শিখা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু একে কনক্রিটে রূপ দিয়ে তিনি একটা স্থায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, যা আশার প্রতীক।
উত্তর ইংল্যান্ডের কারখানার ছায়া হোক, বার্সেলোনার দেয়াল হোক কিংবা বিশ্বকাপের বৈশ্বিক মঞ্চÑফুটবল আজও শিল্পীদের এমন এক যৌথ অভিজ্ঞতার রসদ জোগায়, যেখানে সৌন্দর্য, বিশ্বাস আর আবেগ একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
